
কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিটি ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে ১০০টি শিশু জন্ম নিচ্ছে। সঠিক শিক্ষার অভাব, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অসচেতনতা এবং কট্টর সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে রোহিঙ্গাদের অনীহাই এই উচ্চ জন্মহারের নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে বাংলাদেশ সরকারকে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ‘দুটির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো হয়’—এই বার্তা রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হলেও তার সুফল মিলছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতিপূর্বে সরকার জন্মহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাইলে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) একে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ আখ্যা দিয়ে বাধা প্রদান করে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এমন আপত্তির কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গতি হারিয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ২ লাখ ৯১ হাজার ৩৯৫টি শিশু জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে ৩৬ হাজার এবং মাসে প্রায় ৩ হাজার নতুন প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে এই ঘিঞ্জি শিবিরগুলোতে।
রোহিঙ্গাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দক্ষিণ এশিয়ার রোহিঙ্গা সংকট বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, রোহিঙ্গারা অত্যন্ত রক্ষণশীল হওয়ায় তাদের বোঝানো কঠিন। তবে এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে এবং মানবপাচারসহ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বর্তমানে সিভিল সার্জন অফিস ও বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং স্ট্র্যাটেজি’র মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সচেতন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে জুমার খুতবায় সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছামূলক হওয়ায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মতে, মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও এই বিশাল জনসংখ্যার চাপ অনন্তকাল বহন করা সম্ভব নয়। একদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা দিন দিন কমছে, অন্যদিকে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে জনসংখ্যা।
দ্রুত ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অন্যথায়, অদূর ভবিষ্যতে এই জনবিস্ফোরণ কক্সবাজার ও ভাসানচরের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
রিপোর্ট : নাসরিন বেগম


