
বিশেষ প্রতিনিধি, চেতনা একুশ
রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ পদ্মা চরাঞ্চল ক্রমেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। বালুমহাল ও চর দখলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, স্পিডবোটে সশস্ত্র টহল, ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় পুরো চরাঞ্চলে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী পদ্মার চরজাজিরা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বালুমহালের ম্যানেজার আজিজুল হাকিম (৩৫)। তিনি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার হিজলি পাবনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে কয়েকটি স্পিডবোটে করে অস্ত্রধারীরা চরাঞ্চলে প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে একটি ড্রোনও ছিল, যা ব্যবহার করে তারা লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করে। পরে এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে আজিজুল হাকিমকে তুলে নিয়ে যায় এবং গুলি করে হত্যা করে।
নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বালুমহালকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের জেরেই এ ঘটনা ঘটে। পরে চরজাজিরা এলাকা থেকে একটি স্পিডবোটে আজিজুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মার চরাঞ্চলে বর্তমানে অন্তত ১১টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর মধ্যে কাঁকন, মণ্ডল, টুকু, সাঈদ, লালচাঁদ, রাখি, শরীফ কাইগি, রাজ্জাক, চল্লিশ, বাহান্ন এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনীর নাম উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ‘কাঁকন বাহিনী’। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল, চাঁদাবাজি, স্পিডবোট ছিনতাই এবং সশস্ত্র মহড়ার মাধ্যমে চরাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাট থেকে শুরু করে নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তৃত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র জানায়, আজিজুল হাকিম হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের শুরু থেকে বালুমহাল ও চর দখলকে কেন্দ্র করে একের পর এক সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং সন্ত্রাসী হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার একাধিক মামলায় কাঁকন বাহিনীসহ প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর নাম উঠে এসেছে।
পুলিশ ও নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কাঁকন বাহিনীকে ঘিরে বিভিন্ন থানায় অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানে বাহিনীটির ১৫ থেকে ২০ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে অস্ত্র, গুলি ও নগদ অর্থ। তবে বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অধরা রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চার জেলার বিস্তীর্ণ ও দুর্গম চরাঞ্চল, নদীপথনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সীমারেখার জটিলতার কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন। সন্ত্রাসীরা দ্রুত এক চর থেকে অন্য চরে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
সর্বশেষ সংঘর্ষে শতাধিক গুলি ছোড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একে-৪৭ ধরনের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আজিজুল হাকিম হত্যার পর নতুন করে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজশাহী ও খুলনা রেঞ্জ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং চার জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামের বিশেষ অভিযানে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএনের সদস্যরা ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করেন এবং ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং চার জেলার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর নদীপথে চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কৃষকরা জমিতে যেতে ভয় পান। গরু চরানো, মাছ ধরা কিংবা ফসল ঘরে তুলতেও বিভিন্ন গোষ্ঠীকে চাঁদা দিতে হয়।
একজন কৃষক বলেন, “আমরা বন্দুকের আওয়াজ শুনে ঘুমাই, আবার গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে। কখন কোথায় সংঘর্ষ শুরু হবে, তা কেউ বলতে পারে না।”
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, পদ্মার চরাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ইতিহাস নতুন নয়। দুই দশক আগে পান্না বাহিনী ও লালচাঁদ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি ঘটেছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটেছে। বালুমহাল ও চরভূমিকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভৌগোলিক দুর্গমতাই তাদের শক্তির মূল উৎস।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সংযোগস্থলে বিস্তৃত পদ্মার চর এখন শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র আধিপত্যের অবসান এবং নিরাপদ জীবন ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় দিন গুনছেন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। প্রশাসনের ঘোষিত অভিযান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।


