Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

মিরপুরে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা: ঘাতক সোহেল ও তার স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড, আদালতে যুগান্তকারী রায়


রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার লোমহর্ষক ঘটনায় মূল আসামি সোহেল রানা এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সাথে আদালত এই জঘন্য অপরাধের জন্য ঘাতক সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯(২) ধারায় অপরাধীদের এই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়।


আজ রবিবার (৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

অর্থদণ্ড পাবে পরিবার, সম্পত্তি নিলামের নির্দেশ

আদালতের রায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিদের জরিমানা করা এই অর্থ ভিকটিম রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। যদি আসামিরা এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই টাকা মৃত শিশুটির পরিবারকে হস্তান্তরের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত।

দেশ কাঁপানো সেই নির্মমতা

গত ১৯ মে মিরপুরের পল্লবীতে নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী রামিসাকে কৌশলে ডেকে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।

ঘটনার দিন সকালে রামিসা স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হলে আসামি স্বপ্না তাকে ফুসলিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে রামিসার মা-বাবা তাকে খুঁজতে গিয়ে আসামির দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই ভেসে ওঠে এক নারকীয় দৃশ্য। ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন দেহ, আর বাথরুমের একটি বড় বালতির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা।


এই চরম নৃশংসতার খবর ছড়িয়ে পড়লে গোটা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আবালবৃদ্ধবনিতা রাজপথে নেমে খুনিদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানান। খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এই ঘটনায় জড়িতদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

মাত্র ১৭ দিনে ন্যায়বিচার: এক অনন্য দৃষ্টান্ত

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র ১৭ দিনের মাথায় এই স্পর্শকাতর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি অনন্য ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।

  • ১৯ মে: নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ফতুল্লা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার এবং পল্লবী থেকে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করা হয়।
  • ২০ মে: শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।
  • ২৪ মে: ডিএনএ টেস্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট ও ময়নাতদন্তের অকাট্য প্রমাণাদিসহ পুলিশ আদালতে নিখুঁত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে।
  • ১ জুন: ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়।
  • ২ জুন: মাত্র এক দিনে রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মা-বাবা, প্রতিবেশী ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞসহ ১৬ জনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন।
  • ৩ জুন: ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন। (যেখানে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ক্ষমা ভিক্ষা চায়)।
  • ৪ জুন: চেইন অব ফ্যাক্ট বা অপরাধের অকাট্য ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি এবং যুক্তিতর্ক সমাপ্ত হয়।
  • ৭ জুন: বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়।

রায়ের প্রতিক্রিয়া

শনিবার এক গোলটেবিল বৈঠকে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শিশু রামিসার বাবা বলেছিলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের খুনিদের শাস্তিই চান না, বরং এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা দেখতে চান যেখানে আর কোনো বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।


আজকের এই কাঙ্ক্ষিত রায়ের মাধ্যমে কেবল দুই ঘাতকের আইনি পরিণতিই নির্ধারিত হয়নি, বরং সমাজ থেকে শিশু নির্যাতন ও নারী সহিংসতা দমনে আদালত একটি কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিলেন। এই রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।

রিপোর্টার : এড্. নাসরিন বেগম, সহ-সম্পাদক, চেতনা একুশ

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ