
প্রতিবেদক: নাসরিন বেগম, চেতনা একুশ
পঞ্জিকার নিয়মে দিনটি ছিল ৫ আগস্ট। তবে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও দেশত্যাগের পর বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়া বাংলাদেশের রাজপথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই উচ্চারিত হতে থাকে এক অভূতপূর্ব ও প্রতীকী শব্দবন্ধ: ‘৩৬ জুলাই’। আপাতদৃষ্টিতে পঞ্জিকার ক্যালেন্ডারে যা এক অসম্ভব দিন, রাজপথের লড়াকু ছাত্র-জনতার কাছে তা রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক সত্য ও বিজয়ের অনন্য স্মারকে।

২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আন্দোলন দমাতে ১৬ জুলাই পুলিশ ও তৎকালীন সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় প্রাণহানি শুরু হলে ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। আন্দোলন দমনের রক্তক্ষয়ী সেই দিনটিতেই প্রাণ হারান ৬ জন। এরপর শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কোটা ব্যবস্থা সংশোধন হলেও, সহযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে রাজপথের সেই লড়াই ততক্ষণে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে।
জুলাইজুড়ে স্বৈরাচারের নৃশংসতায় প্রাণ হারানো শত সহযোদ্ধার স্মরণে আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট প্রতিজ্ঞা ছিল—দাবি আদায় ও স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের সংগ্রামের ‘জুলাই মাস’ শেষ হতে পারে না। সেই দৃপ্ত অঙ্গীকার থেকেই আগস্টের ১ তারিখ থেকে নতুন মাসের গণনা শুরু না করে, পুরো সময়টিকে তাঁরা জুলাইয়ের রক্তের ধারায় প্রবাহিত বর্ধিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে থাকেন।
প্রতিবাদের এই অভিনব ও সৃষ্টিশীল ধারায় ক্যালেন্ডারের ১ আগস্ট রূপ নেয় ‘৩২ জুলাই’-এ, ৪ আগস্ট হয়ে ওঠে ‘৩৫ জুলাই’। অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের দিনটিকে মুক্তিকামী মানুষ চিহ্নিত করে ইতিহাসের পাতায় ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে।
আন্দোলনকারীদের মতে, ‘৩৬ জুলাই’ কোনো সাধারণ পঞ্জিকার তারিখ নয়; এটি শহীদদের ঝরা রক্ত, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বকে চিরঞ্জীব করে রাখার এক প্রতীকী শপথ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে এই একটি দিন তাই বাংলাদেশের মুক্তি ও সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য ও চিরভাস্বর স্থান দখল করে নিয়েছে।


