
প্রতিবেদক : এড্ নাসরিন বেগম
‘নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা ও মরদেহ বিকৃতির মতো জঘন্য অপরাধে কোনো নমনীয়তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি’—আদালত
চট্টগ্রামে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।
বুধবার চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জনাব মুহাম্মদ আলী আক্কাস আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, “হত্যাকাণ্ডটি একটি জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ। এটি শুধু একজন নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা নয়, বরং হত্যার পর মৃতদেহের ওপর নির্মম নির্যাতনেরও শামিল। মরদেহকে ছয় টুকরো করে বিকৃত ও অবমাননা করার মাধ্যমে অপরাধের ভয়াবহতা আরও বেড়েছে। এটি মানবিক মূল্যবোধের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ এবং সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ঘটনা। এমন অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।”
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) জালাল উদ্দিন জানান, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এ দণ্ডাদেশ দিয়েছেন।
গত ২৩ মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য ধার্য্য রাখা হয়েছিল।
যেভাবে ঘটেছিল নৃশংস হত্যাকাণ্ড
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার নয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আলিনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হয়। পরে জানা যায়, প্রতিবেশী আবীর আলী তাকে হত্যা করে মরদেহ টুকরো টুকরো করে সাগরে ফেলে দিয়েছেন।
ঘটনার দিন বিকেলে মসজিদে আরবি পড়তে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় আয়াত। তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জিজ্ঞাসাবাদে আবীর হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং জানান, হত্যার পর মরদেহ ছয় টুকরো করে সাগরের পানিতে ভাসিয়ে দেন।
তদন্তে উঠে আসে, আবীরের পরিবার দীর্ঘদিন আয়াতদের বাড়ির ভাড়াটিয়া ছিল। পারিবারিক কারণে আলাদা বাসায় বসবাস করলেও আয়াতদের পরিবারের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল দীর্ঘদিনের।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন আবীর আয়াতকে কোলে করে একটি কক্ষে নিয়ে যান এবং সেখানে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে মরদেহ নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করেন।
মুক্তিপণের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় হত্যা
তদন্তে জানা যায়, মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে আয়াতকে অপহরণ করেছিলেন আবীর। কিন্তু কোথাও লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে না পেরে তিনি শিশুটিকে হত্যা করেন। পরে আয়াতের পরিবারের কাছে টাকা দাবি করার পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
ঘটনার তদন্তে পিবিআই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বটি, আয়াতের জুতা এবং মরদেহের বিভিন্ন খণ্ড উদ্ধার করে। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর আকমল আলী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে আয়াতের দুই পা উদ্ধার করা হয়। পরদিন উদ্ধার করা হয় তার খণ্ডিত মাথা।
এ ছাড়া আবীরের বাসা থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তা আয়াতের ডিএনএর সঙ্গে মিলে যায়, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে বিচার
ঘটনার পর আয়াতের বাবা ইপিজেড থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মনোজ কুমার দে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে আবীর আলীকে একমাত্র আসামি করা হয় এবং তার বাবা-মা ও বোনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ গুমের ঘটনা জেনেও গোপন রাখার অভিযোগে এক কিশোরের বিরুদ্ধে পৃথক দোষীপত্র দেওয়া হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার বর্তমানে শিশু আদালতে চলমান রয়েছে।
শিশু আয়াত হত্যা মামলাটি দেশের অন্যতম আলোচিত অপরাধ হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। চার বছর পর সেই মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন আদালত।


