Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

নাশকতার নতুন ছক ফাঁস: নিজেদের বাসেই আগুন, টার্গেট রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিম

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ

রাজধানীসহ সারা দেশে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া নাশকতার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে আগুন দেওয়া বেশ কয়েকটি বাসের মালিক আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের বাসেই আগুন দিয়ে একই সঙ্গে জনমনে আতঙ্ক, রাজনৈতিক ফায়দা এবং বিমার অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।

শুধু গণপরিবহণ নয়, নাশকতার সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে মেট্রোরেল, রেলপথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নামও উঠে এসেছে তদন্তে। এরই মধ্যে রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। বসানো হয়েছে অতিরিক্ত চেকপোস্ট। ড্রোনেও চলছে পর্যবেক্ষণ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, নাশকতাকারীরা এবার ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল নিয়েছে। আকস্মিকভাবে ককটেল বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগ করে মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে সরে যাচ্ছে তারা। রাজধানীর প্রান্তিক এলাকাগুলোকে এ জন্য বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীতে একযোগে মাঠে নেমেছে এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের সব বিভাগ ও জেলায়ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

ফাঁস হয়েছে নাশকতার ছক

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, নাশকতার ধরন, সম্ভাব্য লক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে রাজধানীর প্রবেশমুখ এবং পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে।

পূর্বাঞ্চলের ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, বাসাবো ও খিলগাঁও এবং পশ্চিমাঞ্চলের গাবতলী, মোহাম্মদপুর, বসিলা ও মিরপুরের শেষ অংশকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

এসব এলাকায় অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানোর পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রথমে ককটেল নিক্ষেপ বা বিস্ফোরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এরপর সুযোগ বুঝে বাসে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। বড় ধরনের নাশকতার অংশ হিসেবে রেল যোগাযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাদের তথ্য পুলিশের হাতে

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনার পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কেপিআই এলাকায় নিয়মিত নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশেষ টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব স্থাপনার তালিকা তৈরি করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অর্থ জোগান ও ইন্ধনের অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওই গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই দেশের ভেতরে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ পাঠানোর তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তার দাবি, ওই নির্দেশনার ভিত্তিতেই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। অর্থ জোগানদাতা ও মূল নির্দেশদাতাদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

যে বাসে আগুন, মালিকানায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দাবি

পুলিশের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়া গণপরিবহণের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বা সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, নিজেদের মালিকানাধীন বাসে আগুন দেওয়ার মাধ্যমে একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনগণের সহানুভূতি আদায় এবং সরকারের ওপর দায় চাপানোর কৌশলও নেওয়া হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।

তদন্তকারীদের মতে, পরিবহণ খাতে আতঙ্ক সৃষ্টি করে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত করাও এই কর্মকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। একই সঙ্গে রেল যোগাযোগে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

কমলাপুরে ককটেল বিস্ফোরণ: গ্রেফতার ২

রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ইনচার্জ) ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান জানান, রেলস্টেশনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের পর সারা দেশের রেলপথ ও স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও সাইমুন নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রায়হান বাংলাদেশ রেলওয়ের কমলাপুর রেলস্টেশনের এমওডি শাখায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বলে জানিয়েছে পুলিশ। সাইমুন শাহজাহানপুর থানা এলাকার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী বলে দাবি করা হয়েছে।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম ও পরিচয় পাওয়া গেছে বলে জানান রেলওয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

রোববার রাতে ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায়ও একটি মামলা হয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

কেন পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে টার্গেট?

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, নাশকতাকারীদের অন্যতম লক্ষ্য রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত। কারণ, এসব এলাকা দিয়ে হামলার পর দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যাওয়া কিংবা নগরীর ভেতরের বিভিন্ন অলিগলিতে আত্মগোপন করা তুলনামূলক সহজ।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় এলাকার তুলনায় রাজধানীর কিছু প্রান্তিক এলাকায় সিসিটিভি নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল কম থাকার সুযোগ নিতে পারে দুর্বৃত্তরা।

ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা বাসে আগুন—ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার জন্য এসব এলাকাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

ভিড়ের সুযোগে নাশকতার আশঙ্কা

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহণে আগুন, ককটেল নিক্ষেপ ও নাশকতার অন্যতম উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ—এমন একটি চিত্র তৈরি করা।

ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম সীমানার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব এলাকা রাজধানীর প্রবেশদ্বার ও প্রান্তিক হওয়ায় অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত সরে যেতে পারে।

তার ভাষ্য, এসব এলাকায় ঘনবসতি এবং নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বসবাস বেশি। ফলে অপরাধীদের আত্মগোপনের সুযোগ তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, মিরপুর ও পল্লবীর গণপরিবহণে অতিরিক্ত ভিড় থাকে। এই ভিড়ের সুযোগ নিয়েও অপরাধীরা নাশকতা ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে।

নাশকতার সম্ভাব্য নতুন কৌশল ও লক্ষ্যস্থলের তথ্য পাওয়ার পর রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাশকতার অর্থদাতা, নির্দেশদাতা ও মাঠপর্যায়ে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ