
নিজস্ব প্রতিবেদক। চেতনা একুশ:
রাজধানীর ফুটপাত কি শুধুই হকার ও অবৈধ দোকানপাটের দখলে থাকবে, নাকি নগরবাসীর নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করবে—দীর্ঘদিনের এই প্রশ্নের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্থানের ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নিউ মার্কেটের সামনের ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা ও হকারদের সরিয়ে দেওয়ার ফলে দীর্ঘদিন পর এসব এলাকায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটার পরিবেশ ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে ফুটপাতগুলোকে পরিচ্ছন্ন, দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে শুধু পথচারীদের চলাচলের সুযোগই তৈরি হয়নি, বদলে গেছে আশপাশের পরিবেশের চিত্রও।
দীর্ঘদিন ধরে এসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাত অবৈধ দখলে থাকায় সাধারণ মানুষকে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। ফুটপাত দিয়ে চলাচলের সুযোগ না থাকায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিসহ পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করতে হতো। এতে একদিকে যেমন বাড়ছিল যানজট, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছিল সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
ডিএসসিসির সাম্প্রতিক উদ্যোগে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে। দখলমুক্ত ফুটপাতগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি। রাস্তার পাশের দেওয়ালে আঁকা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের বর্ণিল গ্রাফিতি। এসব চিত্রকর্মে স্থান পেয়েছে ফুল, প্রকৃতি, দেশের স্বাধিকার আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি।
পাশাপাশি ফুটপাতের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে টবে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছপালা। দেয়ালের রঙিন চিত্রকর্ম ও সবুজের সমন্বয়ে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে নান্দনিক পরিবেশ। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও এমন উদ্যোগ পথচারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
ডিএসসিসির ফেসবুক পোস্টে ব্যতিক্রমী বার্তা
ফুটপাত দখলমুক্ত করার এই উদ্যোগের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ব্যতিক্রমী বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনটি ছবির সমন্বয়ে তৈরি একটি কোলাজ পোস্টারের সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে সংস্থাটি লিখেছে—
‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা মেডিকেল ও নিউ মার্কেটের সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করায় অনেকেই খুশি হলেও সবাইকে খুশি করতে পারিনি! স্যরি।’
ডিএসসিসির এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফুটপাত দখলমুক্ত করার ফলে সাধারণ পথচারীরা উপকৃত হলেও যাঁরা দীর্ঘদিন এসব জায়গায় দোকানপাট বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, তাঁদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সংস্থাটির পোস্টে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
ফুটপাতের অধিকার পথচারীদের, পুনর্বাসনের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের আলোচনায় ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে ফুটপাতের প্রধান ব্যবহারকারী পথচারীরা। অথচ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের হাঁটার অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার আশপাশে ফুটপাত দখল হয়ে থাকলে জনদুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কর্মজীবী নাগরিক—সবাইকে এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়।
তবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উচ্ছেদ অভিযান যেন কেবল সাময়িক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য নিয়মিত তদারকি, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নিউ মার্কেট এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের এই উদ্যোগ রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু এই তিনটি এলাকাই নয়, রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতও দখলমুক্ত করে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা হবে।
কারণ ফুটপাত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি নগরবাসীর চলাচলের অধিকার এবং একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহরের অপরিহার্য অংশ।


