
নিজস্ব প্রতিবেদক। চেতনা একুশ:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে জেল কোড অনুযায়ী তার চিকিৎসা ও ডিভিশনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আমীর হোসেন আদালতে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। অন্যদিকে, তার পক্ষে আইনজীবী চৌধুরী মো. গালিব রাগীব কোনো জামিন আবেদন করেননি। তবে কারাগারে সুচিকিৎসা ও ডিভিশন সুবিধা নিশ্চিত করার আবেদন জানান।
শুনানিতে আইনজীবী চৌধুরী মো. গালিব রাগীব আদালতকে বলেন, তার মক্কেল ডিবিসি নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। তিনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ। তার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্নায়বিক সমস্যা রয়েছে। এ অবস্থায় কারাগারে তার জন্য ডিভিশন সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আবেদন জানান তিনি।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উপস্থাপন করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে ইকবাল সোবহান চৌধুরী ডিবিসি টেলিভিশনের মালিকানা লাভ করেন এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। ওই পদে থেকে তিনি বিভিন্ন টেলিভিশনের লাইসেন্স প্রদান, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর প্রভাব বিস্তারের কাজে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ও আন্দোলনসংক্রান্ত সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচার বাধাগ্রস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবুসহ একটি সংগঠন গঠন এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তুলে ধরা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি রাজধানীর গুলশান ও বনানী এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন পাবলিক প্রসিকিউটর।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ইকবাল সোবহান চৌধুরী আত্মগোপনে চলে যান। যাত্রাবাড়ীতে মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হত্যার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পরবর্তী সময়ে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে উল্লেখ করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানায় রাষ্ট্রপক্ষ।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পাশাপাশি জেল কোডের বিধান অনুসরণ করে তার চিকিৎসা ও ডিভিশন সুবিধার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ডিবিসি কার্যালয় থেকে আটক
এর আগে বুধবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের কার্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে যাত্রাবাড়ীতে মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
যেভাবে হত্যা করা হয় মাদ্রাসাছাত্র আরিফকে
মামলার এজাহার ও বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার কুতুবখালী এলাকার বউবাজার রোডে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
এ সময় গুলিবিদ্ধ হয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ফাজিল মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ। তার চোখে গুলি লাগে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহত আরিফের বাবা ইউসুফ ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৩৩ জনকে আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার ৫৩ নম্বর আসামি হিসেবে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নাম উল্লেখ রয়েছে।
মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।


