
নিজস্ব প্রতিবেদক | চেতনা একুশ:
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য মোঃ তিতাস শেখ (২৭)। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে সংঘটিত এ অভিযানে মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে জিম্মি অবস্থায় থাকা ৫৭ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালি নাগরিককে নিরাপদে উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী।
দায়িত্ব পালনকালে এক তরুণ সেনাসদস্যের এই আত্মত্যাগে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অন্যদিকে, মানবপাচারকারী চক্রের কবল থেকে জিম্মিদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর এ অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুর্গম পাহাড়ে অভিযান
সেনাবাহিনীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গোয়েন্দা সূত্রে টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহীন পাহাড়ে একটি সশস্ত্র মানবপাচারকারী চক্রের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। চক্রটির সদস্যসংখ্যা ছিল আনুমানিক ১৫ থেকে ১৬ জন। তারা প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালি নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়।
এ তথ্য পাওয়ার পর জিম্মিদের উদ্ধার এবং মানবপাচারকারীদের আটক করতে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় পুলিশের সমন্বয়ে একটি যৌথ আভিযানিক দল গঠন করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে দলটি রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান শুরু করে।
যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি চালায় পাচারকারীরা
অভিযানকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারীরা অতর্কিতভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে পাহাড়ি এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জিম্মিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিজেদের সুরক্ষায় যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়।
এ সময় মানবপাচারকারীদের ছোড়া গুলি সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখের বাম কাঁধে লাগে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষের মধ্যে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
প্রাণপণ চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি সেনাসদস্য তিতাসকে
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিতাস শেখের শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। তাকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়।
তবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালনকালে ২৭ বছর বয়সী এই সেনাসদস্যের মৃত্যুতে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
পাঁচ মানবপাচারকারী আটক, উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ
সংঘর্ষের পর যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করে। এ সময় তাদের ব্যবহৃত একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক এবং চার রাউন্ড তাজা গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো, দীর্ঘ সময় ধরে জিম্মি থাকা ৫৭ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালি নাগরিককে নিরাপদে উদ্ধার করা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রোহিঙ্গা ও বাঙালি—উভয় সম্প্রদায়ের নাগরিক রয়েছেন।
তবে গোয়েন্দা তথ্যে প্রায় ১২০ জনকে জিম্মি করে রাখার কথা উল্লেখ থাকায় বাকি জিম্মিদের উদ্ধারে পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
শহীদ সেনাসদস্যের পরিবারের প্রতি সেনাবাহিনীর সমবেদনা
কর্তব্য পালনকালে প্রাণ উৎসর্গ করা সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানানো হয়েছে।
টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে এই অভিযান আবারও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মানবপাচারের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। জিম্মিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাকি জিম্মিদের উদ্ধার এবং অপরাধী চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


