Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

অন্তর্বর্তী সরকারের চরম উদাসীনতায় হামের টিকার ঘাটতি ও শিশু মৃত্যু: ইউনিসেফ

বাংলাদেশে ইউনিসেফ এর প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স

ডেস্ক রিপোর্ট, চেতনা একুশ

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের চরম নীতিগত ভুল, সিদ্ধান্তহীনতা এবং উদাসীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ শিশুদের। দেশে টিকার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং এর ফলে মহামারি আকারে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে তৎকালীন ইউনূস সরকারকে ‘বহুবার’ সতর্ক করেছিল জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাকে তোয়াক্কা না করায় শেষ পর্যন্ত দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং অসংখ্য শিশুর প্রাণহানি হয়।

সম্প্রতি ইউনিসেফ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

বারবার সতর্কবার্তা, তবুও মেলেনি সাড়া

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে একটি অত্যন্ত জরুরি দাপ্তরিক চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল যে, হাম-রুবেলা, পোলিও, যক্ষ্মা ও টিটেনাসের মতো জীবনরক্ষাকারী টিকার মজুদ ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, শুধু চিঠিতেই নয়, এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে এই আসন্ন সংকটের কথা এবং এর ফলে শিশু মৃত্যুর আশঙ্কার বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রশাসন এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়।

ভুল নীতি ও আইনি জটিলতায় সংকটের শুরু

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ও সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মানসম্মত টিকা আমদানি করত। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই এই প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া বাতিল করে। তারা রাজস্ব বাজেটের আওতায় উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতির মাধ্যমে টিকা কেনার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কিনতে ৮ থেকে ১১ মাস সময় লেগে যায়, যা একটি জরুরি জাতীয় কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও সে সময় সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ফেরার জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই যৌক্তিক পরামর্শও আমল দেয়নি। এর পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের কর্মবিরতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

মূল্য দিতে হলো শত শত শিশুর প্রাণ

সরকারের এই উদাসীনতার ফল প্রকাশ পায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, যখন দেশজুড়ে হঠাৎ করেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৪৫১টি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, যার মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৭৪ জনের নিশ্চিত হামের প্রমাণ মিলেছে। চিকিৎসকদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ এই বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যুর জন্য তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ও দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

বর্তমান সরকারের জরুরি পদক্ষেপ ও স্বস্তি

বিগত সরকারের রেখে যাওয়া এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশৃঙ্খলা থেকে দেশকে মুক্ত করতে নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রুত ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

রানা ফ্লাওয়ার্স জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি ও মার্কিন সরকারের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যা পরবর্তীতে জাতীয় হাম কর্মসূচিতে রূপ নেয়। গত ১০ মে’র মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই টিকার আওতায় এনে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

ভবিষ্যতে যেন দেশের শিশুদের আর কোনো সংকটে পড়তে না হয়, সেজন্য বর্তমান সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের জটিলতা পরিহার করে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ও দ্রুত টিকা কেনার পূর্বের সফল পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সরকারের এই যুগোপযোগী ও দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছে ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলো।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ