
একসময় মানুষ মনের জমানো গোপন কথা কিংবা জীবনের কঠিন সংকটে পরম ভরসা রাখতো কাছের বন্ধু বা বড় ভাইয়ের কাঁধে। সময়ের বিবর্তনে সেই স্থানটি দখল করেছিল গুগল। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই যুগে এখন মানুষের আস্থার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন চ্যাটবট— যার মধ্যে অন্যতম চ্যাটজিপিটি।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের করা কোটি কোটি প্রশ্নের ব্যবচ্ছেদ করলে বেরিয়ে আসছে এক অবাক করা চিত্র। সেখানে যেমন আছে প্রযুক্তির ব্যবহার, তেমনি ফুটে উঠছে আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, ভয়, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার এক গভীর গল্প।
সম্পর্কের টানাপোড়েনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরামর্শ
বিভিন্ন জরিপ বলছে, চ্যাটবট ব্যবহারকারীদের একটি বিশাল অংশ ব্যক্তিগত সম্পর্কের গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছেন। “সে কেন যোগাযোগ বন্ধ করে দিল?”, “বিচ্ছেদের ক্ষত কীভাবে কাটিয়ে উঠবো?” কিংবা “তাকে কি আবারও মেসেজ দেওয়া ঠিক হবে?”— এমন সব আবেগপ্রবণ প্রশ্নে সয়লাব চ্যাটজিপিটির চ্যাটবক্স। মানুষ এমন সব কথা এখানে অকপটে বলছে, যা হয়তো লোকলজ্জার ভয়ে পরম বন্ধুর কাছেও বলা সম্ভব নয়। বিচারহীন ও নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়াই যেন এখানে মানুষের সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা।
একাকিত্ব আর বিষণ্ণতার আড়ালে ডিজিটাল সঙ্গী
তথ্য জানার পাশাপাশি এখন মানুষ চ্যাটজিপিটিকে বেছে নিচ্ছে নিজের একাকিত্ব ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে। “আমার এত খারাপ লাগছে কেন?” কিংবা হতাশার চরম মুহূর্তে নিজের অনুভূতির কথা শেয়ার করার জন্য মানুষ এখন রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে এই ডিজিটাল সঙ্গীকেই বেশি নিরাপদ ভাবছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা বাহ্যিকভাবে অনেক বেশি সংযুক্ত হলেও মানসিকভাবে দিন দিন একা হয়ে পড়ছি। আর সেই শূন্যস্থানটিই পূরণ করছে এই এআই।
ক্যারিয়ার ও দক্ষতার ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট
ব্যক্তিগত সমস্যার বাইরেও পড়াশোনা ও পেশাগত জীবনে চ্যাটজিপিটি এখন অপরিহার্য। জীবনবৃত্তান্ত (CV) তৈরি, পেশাদার ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে জটিল প্রোগ্রামিং বা ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধিতে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি এখন অন্যতম সেরা “ডিজিটাল সহকারী”।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও আয়ের নতুন পথ
মানুষ শুধু বর্তমান নিয়ে নয়, আগামীর অনিশ্চয়তা নিয়েও প্রশ্ন করছে এআইকে। অনলাইনে আয়ের উপায়, ভবিষ্যতের চাকরির বাজার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ কেড়ে নেবে কি না— এমন সব কৌতূহল মানুষের ভেতরে কাজ করা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
তবে সাবধানতার বিকল্প নেই
চ্যাটবট যতই মানবিক আচরণ করুক না কেন, বিশেষজ্ঞরা একে কেবল একটি প্রোগ্রাম হিসেবেই দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যগত জটিলতা, গুরুতর মানসিক সমস্যা কিংবা আইনি বিষয়ে শুধুমাত্র এআই-এর ওপর নির্ভর করা বড় ধরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিশেষজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শেষ কথা
মানুষ চ্যাটজিপিটির কাছে আসলে কী জানতে চায়? এই প্রশ্নের গভীরে লুকানো আছে আধুনিক মানুষের অন্তর্গত হাহাকার আর উত্তর খোঁজার আকুলতা। ভালোবাসা, ভয়, ক্যারিয়ার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার এই গোলকধাঁধায় মানুষ এখন তার নতুন ডিজিটাল সঙ্গীর হৃদয়েই শান্তির খোঁজ চালাচ্ছে।
লেখক : এড্. নাসরিন বেগম


