
নিজস্ব প্রতিবেদক । চেতনা একুশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক স্লোগান ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-কে সরাসরি ‘হাদিস’ ও ‘শাশ্বত বাণী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান। তার এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এর মধ্যেই তাকে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন উপসচিব জেতী প্রু। তবে প্রজ্ঞাপনে মসিউর রহমানকে দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
যে বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত
গত ১ নভেম্বর রাজধানীতে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ উদ্যোগের আওতায় ছয়টি নির্দিষ্ট রুটে পরীক্ষামূলক বাস চলাচলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক স্লোগান ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-কে হাদিসের সঙ্গে তুলনা করেন। এমনকি নিজের বক্তব্যের শুরুতেই তিনি স্বীকার করেন, তার এই মন্তব্যকে অনেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ভালো পদায়ন বা পদোন্নতি পাওয়ার আশায় তোষামোদ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
মসিউর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই স্লোগানকে ‘হাদিস’ বললে অনেকের মনে হতে পারে, তিনি পরবর্তী সময়ে ভালো কোনো পদে পদায়ন পাওয়ার আশায় এমন মন্তব্য করছেন। তবে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে এটি একটি শাশ্বত ও চিরন্তন বাণী।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার আগে আমরা, আর সবার আগে দেশ—এই কথার বিরোধিতা কে করতে পারবেন? একজন স্বার্থপর ও দেশপ্রেমহীন ব্যক্তি ছাড়া কেউ এ কথার বিরোধিতা করতে পারবেন না। নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নিয়ে চলা এবং সবকিছুর আগে দেশকে প্রাধান্য দেওয়ার যে দর্শন, তারই প্রতিফলন এই স্লোগানে।’
এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্লোগানটি উল্লেখ করে বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ—এটা হাদিস, হাদিস। এটা শাশ্বত বাণী।’
ধর্মীয় প্রসঙ্গ টেনেও মন্তব্য
বক্তব্যের একপর্যায়ে রাজনৈতিক স্লোগানটির সঙ্গে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যের তুলনা টানেন মসিউর রহমান। তিনি বলেন, একই কথা কোনো আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বললে মানুষ হয়তো সেটিকে হাদিস হিসেবে গ্রহণ করত।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বাহ্যিক অবয়বের প্রসঙ্গ টেনেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর মুখে দাড়ি নেই কিংবা তিনি মাথায় টুপি পরেন না বলেই হয়তো অনেকে স্লোগানটিকে হাদিস হিসেবে বিবেচনা করছেন না। তবে তিনি নিজে এটিকে হাদিস বলেই মনে করেন।
একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার মুখে রাজনৈতিক স্লোগানকে ধর্মীয় হাদিসের সঙ্গে তুলনা করে এমন বক্তব্য আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা
অনুষ্ঠানে দেওয়া মসিউর রহমানের বক্তব্যের ভিডিওর একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব ও নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে এমন মন্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
সমালোচকদের আলোচনায় উঠে আসে, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাগত নিরপেক্ষতা, সংযম ও প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি। রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে ধর্মীয় পরিভাষার এমন তুলনা সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সীমারেখা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত, নতুন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ
বিতর্কের মধ্যেই মোহাম্মদ মসিউর রহমানকে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাঁকে মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত জানানো হলেও এ সিদ্ধান্তের পেছনে তার বিতর্কিত বক্তব্যের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা থাকলেও সরকারি প্রজ্ঞাপন থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো কারণ জানা যায়নি।
অন্যদিকে, ডিটিসিএর নতুন নির্বাহী পরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক স্লোগানকে ধর্মীয় হাদিসের সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া বক্তব্য এবং এর পরপরই দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীল বক্তব্য ও প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


