
নিজস্ব প্রতিবেদক। চেতনা একুশ:
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে পুঁজি করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশের শিল্পকারখানায় ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করার ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে দেশের বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়ার অপচেষ্টা রয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের আবেগ ও অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দেশের শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বাগেরহাটের খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্পকারখানার নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
শ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে শিল্প ধ্বংসের অপচেষ্টা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষ নিজের রুটিরুজির অবলম্বন নিজের হাতে ধ্বংস করতে পারেন না। যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করে একজন শ্রমিক তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ করেন, সেই প্রতিষ্ঠানেই তিনি ভাঙচুর চালাবেন—এটি স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে না। অথচ একটি বিশেষ মহল শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়াকে সামনে রেখে বিভিন্ন কলকারখানায় বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, দেশের শিল্পকারখানাগুলো এক দিনে গড়ে ওঠেনি। গত পাঁচ দশকে বহু মানুষের শ্রম, মেধা ও বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে অসংখ্য মা-বোনের জীবিকা ও পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এই শিল্প খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শিল্পকারখানাগুলোকে শুধু মালিকের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জাতীয় স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। তাই পরিকল্পিতভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর কিংবা উৎপাদন ব্যাহত করার অর্থ হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।
সীমান্তের ওপার থেকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৫ থেকে ১৬ বছর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তারা সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিবর্তে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট এবং দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, তাদের একটি অংশ এখন দেশের বাইরে অবস্থান করে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে নানা ধরনের তৎপরতার মাধ্যমে দেশের ভেতরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কোনো মহল যদি রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে শিল্প খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক স্বার্থের পরিপন্থী।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতে সরকারের উদ্যোগ
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও তাঁদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডটি শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ইনশাআল্লাহ, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি ঘোষণা ও নির্ধারণ করা হবে। সরকার চায়, শ্রমিকরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার পান এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।
শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঐক্যের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া চলবে, মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে; তবে সেই দাবিকে কেন্দ্র করে কোনোভাবেই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস কিংবা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
তিনি দেশের শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।


