
চেতনা একুশ প্রতিবেদক | আশুলিয়া (সাভার)
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সরকারি ঘোষণার পরও শান্ত হয়নি দেশের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাকশিল্প এলাকা আশুলিয়া। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পোশাকশ্রমিকেরা। মঙ্গলবার সকাল থেকে নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধের চেষ্টা এবং পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে বেলা ৩টা পর্যন্ত আশুলিয়ার শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
কর্মবিরতি থেকে সড়কে শ্রমিকদের বিক্ষোভ
শিল্প পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে শ্রমিকেরা প্রতিদিনের মতো নির্ধারিত সময়ে নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করে হাজিরা দেন। তবে কাজে যোগ না দিয়ে বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন তাঁরা।
একপর্যায়ে কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কায় অনন্ত গার্মেন্টস, ডেকো গার্মেন্টস, নিউ এজ, আল-মুসলিম, সাদিয়া ফ্যাশন, নীট এশিয়া, হা-মীম গ্রুপ ও শারমিন গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি বড় পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
কারখানা ছুটি ঘোষণার পর শ্রমিকেরা দলবদ্ধভাবে বের হয়ে আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা চালান। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
নিশ্চিন্তপুর থেকে নরসিংহপুর পর্যন্ত উত্তেজনা
শিল্প পুলিশের সূত্র জানায়, সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত নিশ্চিন্তপুর থেকে নরসিংহপুর পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিশেষ করে ইউনিক এলাকায় পরিস্থিতি বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।
এ সময় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। জবাবে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আশ্বাস নয়, কার্যকর বেতনকাঠামো চান শ্রমিকেরা
আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা তাঁদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। দ্রুত নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্দোলনরত একটি পোশাক কারখানার এক শ্রমিক চেতনা একুশকে বলেন, ‘শুধু খাতা-কলমে মজুরি বোর্ড গঠন করলেই আমাদের পেটের ক্ষুধা মিটবে না। আমরা এর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন চাই। আশ্বাসে আর কাজ হবে না। অবিলম্বে নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করতে হবে।’
দুপুরের মধ্যেই ৭০ কারখানায় ছুটি
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার মধ্যেই প্রায় ৭০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা নিজেরাই কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যান।
তিনি আরও জানান, মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যাহত
মজুরি বোর্ড গঠনের সরকারি ঘোষণার পরও শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত থাকায় আশুলিয়ার পোশাকশিল্পে অস্থিরতা কাটছে না। মঙ্গলবারের সংঘর্ষ, কর্মবিরতি ও কারখানা ছুটির ঘটনায় শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।


