Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

উচ্চকক্ষ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধীদের উদ্দেশ্যে-‘লংমার্চ করে সমাধান হবে না, বিশেষ কমিটিতে আসুন’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর মনসুন থিয়েটারে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিচ্ছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক | চেতনা একুশ, ঢাকা |

জাতীয় সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনসহ সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসনে বিরোধী দলগুলোকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা ও এখতিয়ার কী হবে, সংবিধানের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোতে উচ্চকক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে কি না—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজপথের আন্দোলন বা লংমার্চের পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে আলোচনায় অংশ নেওয়া উচিত।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে আয়োজিত সেমিনারের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’।

ঐকমত্যের ভিত্তিতে দীর্ঘস্থায়ী সংস্কারের ওপর গুরুত্ব

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার দেশে একটি টেকসই, কার্যকর ও সর্বজনগ্রাহ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও বিরোধ এড়িয়ে সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর রাখতে স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর ভাষায়, “প্রতিষ্ঠান গড়ার পাশাপাশি সেগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানই একক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।”

বিশেষ কমিটিতে বিরোধীদের জন্য পাঁচটি আসন খালি

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ওই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হলেও এখন পর্যন্ত তারা সেখানে প্রতিনিধি পাঠায়নি।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের দাবি, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ উল্লেখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তাদের বক্তব্য, বিদ্যমান সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এসব পরিবর্তন আনার পরিবর্তে গণভোটের রায় অনুসরণ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এ দাবিতে তারা খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, সরকার বিদ্যমান সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই বিশেষ কমিটির আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়। এ অবস্থায় বিরোধী দলগুলোকে বিশেষ কমিটিতে অংশ নিয়ে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার তাগিদ আসিফ নজরুলের

সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কয়েকটি বিষয় আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকার কিংবা বিরোধী দল—কোনো পক্ষই রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টির সুযোগ নিতে না পারে।

আসিফ নজরুল বলেন, “ব্যক্তি বা প্রধানমন্ত্রীর সততার চেয়ে একটি দেশের উন্নতির জন্য কার্যকর রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অনেক বেশি জরুরি।”

রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

এ সময় তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে রয়েছে—আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং উচ্চকক্ষের সদস্যদের জন্য বেতন, গাড়ি ও বাড়িসহ অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা না রাখা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এ ছাড়া সংসদীয় জবাবদিহিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার পাশাপাশি এসব কমিটির তলব করার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন সাবেক এই আইন উপদেষ্টা।

১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে আলোচনায় আবেগনির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার আহ্বান জানান আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, মূল সংবিধানে সংরক্ষিত মৌলিক অধিকারের ইতিবাচক দিকগুলো যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া কালাকানুনগুলোরও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ দরকার।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ