
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | চেতনা একুশ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক নীতি, শুল্ক আরোপ এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেই রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিলেন। এমনকি ভোটারদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই যেন তাঁকে সামনে রেখে ভোট দেওয়া হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল তাঁর প্রত্যাশার বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেসব এলাকার বেশ কয়েকটিতেই এবার রিপাবলিকান প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছেন।
বিশেষ করে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের জয় মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। একই অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকেও পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে টেক্সাসে এমন ফলাফলকে দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাউথ ক্যারোলাইনা ও কানসাসেও ডেমোক্র্যাটদের বিজয় নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সাউথ ক্যারোলাইনায় ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাটরা সিনেট আসনটি জয় করেছে। এসব ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়েছে, এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রচলিত রাজনৈতিক দুর্গেও ভোটারদের সমর্থনে পরিবর্তন এসেছে।
নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা ছিল। এসব বিষয় নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া রিপাবলিকান প্রার্থীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমালোচনাও নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্পের সমর্থন এবং প্রচারণায় সরাসরি অংশগ্রহণ সত্ত্বেও তাদের অনেকেই জয় নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে দলের ভেতরে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব এবং তার নির্বাচনী কৌশলের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর ট্রাম্প নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, তিনি নিজে ব্যালটে ছিলেন না। তার ভাষ্য, তিনি নির্বাচনে প্রার্থী না থাকায় রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিতসংখ্যক ভোটারকে কেন্দ্রে আনতে পারেনি। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় তার ব্যাপক উপস্থিতি এবং দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে সরাসরি সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব নিয়েও ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে এই ফলাফলকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অবস্থান ও জনসমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, আইন প্রণয়ন এবং সরকারি কার্যক্রমে বিরোধী দলের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি ও তদন্তের সুযোগও বাড়বে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির এই পরাজয় শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।


