Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

ইসরায়েলের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া: ‘নেতানিয়াহু হেরে গেছেন’, বুথফেরত সমীক্ষার পর ঘোষণা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনেটের

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ‘বেয়াহাদ পার্টি’র প্রধান নাফতালি বেনেট। ইনসেটে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি-সংগৃহীত

ডিজিটাল ডেস্ক । চেতনা একুশ

চেতনা একুশ ডেস্ক: ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে তীব্র পরিবর্তনের হাওয়া। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী জোটের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যে এবার বড় ধরনের ধসের ইঙ্গিত মিলেছে। দেশটিতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষায় (Exit Poll) নেতানিয়াহুর জোট চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ‘বেয়াহাদ পার্টি’র প্রধান নাফতালি বেনেট প্রকাশ্যে নেতানিয়াহু জোটের পরাজয় ঘোষণা করেছেন।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, পার্লামেন্টে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে নেতানিয়াহুর জোট। পূর্বে তাদের আসনসংখ্যা ৬৮ থাকলেও বুথফেরত সমীক্ষায় তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৫০-এ নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

‘৭ অক্টোবরের সরকার বিদায়ের পথে’

মধ্যরাতের পর তেল আবিবে নিজ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমর্থক ও সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নাফতালি বেনেট জোর দিয়ে বলেন, নেতানিয়াহুর এই ঐতিহাসিক পরাজয় মূলত দেশের মানুষের ক্ষোভের প্রতিফলন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আকস্মিক ও রক্তাক্ত ঘটনার সময় যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, ইসরায়েলের জনগণ অবশেষে তাদের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

উপস্থিত উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বেনেট বলেন, “ইসরায়েলের নাগরিকেরা, তোমরা মাথা উঁচু রাখো! আজ বিজয়ের দিন। যারা সততার সঙ্গে দেশের সেবা করে এবং দায়িত্ব পালন করে, তাদের দেশপ্রেমিক জোট পরাজিত করেছে সেনাসেবা বা খসড়া এড়িয়ে চলা গোষ্ঠীগুলোর জোটকে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ইসরায়েলি জনগণ এখন পুরোপুরি সচেতন ও জেগে উঠেছে। তারা স্পষ্ট ভাষায় নিজেদের রায় জানিয়ে দিয়েছে। নেতানিয়াহুর পতন ঘটেছে এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থ সরকার এখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। যারা দেশের মৌলিক দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, তাদের জোটের আসন ৬৮ থেকে কমে মাত্র ৫০-এ এসে ঠেকেছে।”

সামরিক বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক

বেনেটের এই বক্তব্যে মূলত উঠে এসেছে ইসরায়েলের রাজনীতির অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়—‘সামরিক নিয়োগ বা খসড়া বাধ্যবাধকতা’। ইসরায়েলে সাধারণ নাগরিকদের সামরিক দায়িত্ব পালন বাধ্যতামূলক হলেও কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দীর্ঘ দিন ধরে এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি বা ছাড় পেয়ে আসছে। রাজনৈতিক স্বার্থে নেতানিয়াহু সরকার ওই গোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছিল বলে বিরোধী শিবিরের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বেনেটের বক্তব্যে ‘খসড়া এড়িয়ে চলা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে ওই রাজনৈতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিই তীব্র তিরস্কার ফুটে উঠেছে।

বিরোধী শিবিরের উত্থান ও নতুন সমীকরণ

বুথফেরত সমীক্ষার এই ফলাফল ইসরায়েলের জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মোড় উন্মোচন করেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্যাডি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াশার পার্টি’ বিরোধী জোটের অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রধান এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাশাপাশি, বেনেটের ‘বেয়াহাদ পার্টি’ ১২ থেকে ১৩টি আসনে জয় পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সরকার গঠনে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।

নতুন সরকার গঠন প্রসঙ্গে বেনেট স্পষ্ট করেন যে, পরিবর্তনকামী জোটের শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যেই নিজেদের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা ও কৌশলগত সমন্বয় শুরু করে দিয়েছেন। দেশের শাসনব্যবস্থায় এক নতুন, দায়িত্বশীল এবং জনবান্ধব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।

বেনেট আশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এমন এক নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাই, যা কেবল ক্ষমতার রাজনীতি করবে না; বরং জনগণের সুখ-দুঃখের কথা গভীর মনযোগ দিয়ে শুনবে এবং সংকটকালে তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—প্রতিটি তৃণমূল পর্যায়ের গণসমাবেশ থেকে জনগণের যে পরিবর্তনের আকুলতা ও চেতনা উঠে এসেছে, আমরা সেটিকে পার্লামেন্ট ও রাষ্ট্রীয় পরিচালনার মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর।”

বেনেট-লাপিদ অক্ষ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ইসরায়েলের রাজনীতিতে নাফতালি বেনেট এবং ইয়াইর লাপিদের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও রাজনৈতিক রসায়ন বেশ পুরনো। গত এপ্রিল মাসে দুই নেতা রাজনৈতিকভাবে এক হয়ে ‘বেয়াহাদ পার্টি’ গঠন করেন। এর আগে লাপিদ ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় দল ‘ইয়েশ আতিদ পার্টি’র নেতৃত্বে ছিলেন।

উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আদর্শগত চরম মতপার্থক্যের কারণে বেনেট একপর্যায়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি আবারও রাজনীতিতে ফেরেন। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বেনেট ও লাপিদ যৌথভাবে প্রথম রাজনৈতিক জোট গঠন করেছিলেন, যা তৎকালীন নেতানিয়াহু সরকারের ভেতরে ‘ভাইদের জোট’ বা ‘অ্যালায়েন্স অফ ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত লাভ করেছিল।

চূড়ান্ত ফলাফলের অপেক্ষা

বুথফেরত সমীক্ষার এই চমকপ্রদ তথ্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণে আমূল পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করাচ্ছেন যে, বুথফেরত সমীক্ষা কখনোই চূড়ান্ত ফলাফল নয়। নেতানিয়াহু সত্যিই ক্ষমতাচ্যুত হচ্ছেন কি না কিংবা বিরোধী জোট সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ১২০টি আসনের মেজরিটি নিশ্চিত করতে পারে কি না—তা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট গণনা শেষ হওয়া ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ