
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা হয়তো সময়ের সঙ্গে কিছুটা সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু একজন মানুষ কোথায়—বেঁচে আছেন, নাকি নেই—তা না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার যন্ত্রণা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই অনিশ্চয়তা একটি পরিবারকে প্রতিদিন নতুন করে কষ্ট দেয়, থামিয়ে দেয় স্বাভাবিক জীবন।
আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি শুধু গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করার নয়; একই সঙ্গে সেইসব মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের কথা মনে করার দিন, যারা বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশও গুমের ভয়াবহ বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশনের কাছে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মতে, গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি, ২০১৯ সালে ১১৮টি, ২০২২ সালে ১১০টি এবং ২০২৩ সালে ৬৫টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুমের অভিযোগও পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের হার ৬৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন মা-বাবা, একজন স্ত্রী, একটি সন্তান এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাই এর অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তার সন্ধানের অপেক্ষায় ছিল। একের পর এক আশার কথা শুনলেও শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার কোনো পরিণতি হয়নি।
একজন মানুষ মারা গেছেন—এমন সত্য জানা গেলে একটি পরিবার হয়তো একসময় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শোক করার সুযোগ পায়। কিন্তু কেউ কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন—তা না জানার কষ্ট আরও নির্মম। কারণ তখন পরিবারটি একই সঙ্গে শোক ও আশার মধ্যে আটকে থাকে। সময় যত গড়ায়, অপেক্ষার যন্ত্রণা তত গভীর হয়।
২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে স্বজনদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা শুনে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের কান্না ও আর্তনাদে তিনিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট, বেদনা এবং প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি তুলে ধরেন।
সেদিনের কিছু ঘটনা ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। এক শিশু জানিয়েছিল, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন তার এখনো পূরণ হয়নি। আরেক সন্তান বলেছিল, বাবাকে কোনোদিন ‘বাবা’ বলে ডাকতেই পারেনি। কারণ, বাবা নিখোঁজ হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস।
এমন অসংখ্য গল্পের প্রতিটি বাক্যে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর চোখের পানি। এটি শুধু কোনো একটি পরিবারের কান্না নয়—এটি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার ও সত্য জানার আকুতি।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় দাবি—তারা সত্য জানতে চান এবং বিচার চান। তাদের প্রশ্ন, প্রিয়জনকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার কী হয়েছিল এবং কারা এর জন্য দায়ী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাশাপাশি যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
তারেক রহমানও অতীতের গুম ও খুনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে ভবিষ্যতে অন্যায়ের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে বিচার হতে হবে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ যাচাই এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হতে হবে রাষ্ট্রের পথ।
অতীতের ঘটনার বিচার করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন আর কোনো নাগরিক গুমের শিকার না হন, সেই নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ২০২৬ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুমের কারণে মৃত্যু ঘটলে কিংবা দীর্ঘ সময় পরও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না মিললে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ কেবল একটি আইন প্রণয়নের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দায়বদ্ধতারও প্রতীক। একজন নাগরিক তার রাজনৈতিক মত, বিশ্বাস, পরিচয় কিংবা অন্য কোনো কারণে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়া হবেন না—এ নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার অপব্যবহারও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একটি পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় থাকবে?
অবশ্যই না।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মত বা পরিচয়ের কারণে কাউকে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়া হবে না। কোনো পরিবারকে অন্ধকারে রেখে দেওয়া হবে না। কোনো মা তার সন্তানের ভাগ্য জানার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না। কোনো শিশু বাবার ফিরে আসার আশায় শৈশব হারাবে না।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সহানুভূতি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাদের সত্য জানাতে হবে, ন্যায়বিচারের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক, চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা দিতে হবে।
রাষ্ট্রকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে হবে—আপনারা একা নন। আপনাদের কান্না রাষ্ট্র শুনছে। আপনাদের অপেক্ষা রাষ্ট্র দেখছে। আপনাদের প্রশ্ন রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
যে মা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার চোখের পানি যেন বৃথা না যায়। যে সন্তান আজও বাবার স্পর্শের অপেক্ষায়, তার অপেক্ষার যেন একদিন উত্তর মেলে। যে স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীর ফেরার আশায় দিন গুনছেন, তার দীর্ঘশ্বাস যেন একদিন থামে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বাংলাদেশ আর কখনো গুমের অন্ধকারে ফিরে যাবে না। এ দেশে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থাকবে, নিরাপত্তা থাকবে, মর্যাদা থাকবে, আইনের শাসন থাকবে এবং অপরাধের বিচার হবে।
কোনো পরিবারকে যেন আর প্রিয়জনের ভাগ্য না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়। কোনো মায়ের কান্না যেন রাষ্ট্রের কাছে অদৃশ্য না থাকে। কোনো শিশুর শৈশব যেন বাবার অপেক্ষায় থেমে না যায়।
মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে—আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন বাংলাদেশই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে অঙ্গীকার হোক—রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সমান গুরুত্বপূর্ণ।


