
নিজস্ব প্রতিবেদক। চেতনা একুশ:
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়ন, শিশুদের মৌলিক শিখন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার ভিত আরও শক্তিশালী করতে ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে এই অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থী সরাসরি উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন’ শীর্ষক এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পড়া, লেখা ও গণিতে মৌলিক দক্ষতা বাড়ানো। একই সঙ্গে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, বিদ্যালয় পরিচালনায় কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ উদ্যোগ সরকারের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিদ্যালয়ে ভর্তির সাফল্য থাকলেও শিখন দক্ষতায় ঘাটতি
গত দুই দশকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের প্রায় সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হলেও শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকে প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশই বয়স উপযোগী একটি সহজ পাঠ পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। তুলনামূলকভাবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ মালয়েশিয়ায় এ হার ৪২ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে কতটুকু শিখছে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন দেশের শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে এই শিখন ঘাটতি কমিয়ে শিশুদের বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ পেসমে বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। গত দুই দশকে বাংলাদেশের প্রায় সব শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক সহযোগিতা করেছে। নতুন এই অর্থায়ন শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তিও গড়ে তুলবে।
শিক্ষার মান বাড়াতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের বৃহৎ শিক্ষা কাঠামোগুলোর একটি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এনজিও পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কিন্ডারগার্টেন ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধারার প্রতিষ্ঠানে দুই কোটিরও বেশি শিশু প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে।
এত বড় শিক্ষা কাঠামোয় গুণগত পরিবর্তন আনতে নতুন কর্মসূচিতে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
শ্রেণিকক্ষে আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ও পরিকল্পিত পাঠদান: শিক্ষার্থীদের বয়স ও শ্রেণি উপযোগী আকর্ষণীয় শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি কাঠামোবদ্ধ পাঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রধান শিক্ষককে নেতৃত্ব ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের আধুনিক ও কার্যকর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাঠদানের পদ্ধতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা: কোনো শিশু যেন শিখন প্রক্রিয়া থেকে বাদ না পড়ে, সে জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে যেসব জেলার শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগত অর্জনের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে, সেসব এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি: কর্মসূচিটির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি নতুন ও তুলনামূলক আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কর্মসূচির দলনেতা তাশমিনা রহমান বলেন, ভবিষ্যতে সফল কর্মজীবন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য শক্তিশালী মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি অপরিহার্য। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বাজেটের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা হবে।
২৫ বছর মেয়াদি ঋণ, থাকছে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) এই কর্মসূচির অর্থায়ন করছে। সংস্থাটি সাধারণত উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে তুলনামূলক সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
অনুমোদিত অর্থায়নের আওতায় ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২৫ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে অবকাশ সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের পড়াশোনার শক্ত ভিত্তি তৈরি, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তবে অর্থায়নের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন অগ্রগতি নিশ্চিত করাই হবে এই বৃহৎ কর্মসূচির সফলতার মূল বিবেচ্য বিষয়।


