
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ৬ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ক্ষোভ ও শোক কাটতে না কাটতেই এবার বেরিয়ে এলো এক চাঞ্চল্যকর ও অবিশ্বাস্য তথ্য। হাসপাতালের নিচতলাতেই দিব্যি চলছিল একটি বাণিজ্যিক বিস্কুট ফ্যাক্টরি! চিকিৎসালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় এমন বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড দেখে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং বিষয়টি অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
শনিবার (৩০ মে) আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে এই ভয়াবহ চিত্রটি সশরীরে প্রত্যক্ষ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। গত বুধবার (২৭ মে) ভোরে এই হাসপাতালেই ৬টি ফুটফুটে নবজাতকের অকাল মৃত্যু হয়, যা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে।
চিকিৎসালয়ের ভেতরে জ্বলছে ওভেন, উধাও প্রকৌশলীরা
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় নিচতলায় বেকারির অস্তিত্ব দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান পরিদর্শক দল। সেখানে রীতিমতো বাণিজ্যিক ইলেকট্রিক ওভেন চালিয়ে বিস্কুট তৈরি করা হচ্ছিল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা এসে দেখলাম হাসপাতালের ভেতরেই বেকারি চালানো হচ্ছে। বড় বড় ইলেকট্রিক ওভেন চলছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কথা বলার জন্য আমরা কোনো দায়িত্বশীল প্রকৌশলীকে সেখানে খুঁজে পাইনি। কেবল একজন মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে পাওয়া গেছে। এই পুরো বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একই সুরে গভীর দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, “আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ঘটনা চরম দুঃখজনক এবং দায়িত্বহীনতার বহিঃপ্রকাশ। আমরা নিজেরা এসে এই বেকারির সন্ধান পেয়েছি, কিন্তু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সদুত্তর দেওয়ার মতো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে পাওয়া যায়নি।”
৩ জুনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন: অপরাধীদের ছাড় নয়
এদিকে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজ জমা দেওয়ার কথা থাকলেও, তদন্তের স্বার্থে সময় আরও তিন দিন বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আগামী ৩ জুন এই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করা হবে।
সময় বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, সন্তানহারা মায়েদের জবানবন্দি গ্রহণ করা এখনো বাকি রয়েছে। তাদের বক্তব্য যুক্ত না করে কোনো অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন গ্রহণ করা হবে না। মায়েদের কান্নার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
তদন্তের প্রাথমিক কিছু ভয়াবহ তথ্য শেয়ার করে মন্ত্রী আরও বলেন, “এক মায়ের অনুরোধের অজুহাত দিয়ে রাত ২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত দীর্ঘ দুই ঘণ্টা হাসপাতালের এসি বন্ধ রাখা হয়েছিল। এবং সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, ওই সময় বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ন্যূনতম ব্যবস্থাও ছিল না! তদন্তকারীরা হাসপাতালের সার্বিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করছেন। রিপোর্টের ভিত্তিতে দোষী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না, আইন তার নিজস্ব গতিতে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।”
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হানসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন শীর্ষ কর্মকর্তারা।শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে এবং দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে এমন বাণিজ্যিক লোভের হাত থেকে মুক্ত করতে পুরো দেশ এখন ৩ জুনের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছে।


