রাজধানীতে তিন মেট্রোরেল প্রকল্প, বাড়ল দুই প্রকল্পের ব্যয়

নিজস্ব প্রতিবাদক, চেতনা একুশ
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পসহ মোট ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে চলতি অর্থবছরের একনেকের তৃতীয় সভায় প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভা শেষে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার।
অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে ৭টি নতুন এবং ৫টি সংশোধিত। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
তিন মেট্রোরেল প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ
একনেকের সভায় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলমান এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুট প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়।
নতুন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল করিডোর নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে পাতালপথে। প্রকল্পটির জন্য সরকার দেবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ) থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
দ্বিগুণের বেশি বাড়ল দুই মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়
২০১৯ সালে অনুমোদিত এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুট প্রকল্পের প্রাথমিক সম্মিলিত ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সংশোধনের পর দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ আগের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা, যা ১১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) গত আগস্টে প্রস্তাব করা ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি ৯ লাখ টাকার তুলনায় অনুমোদিত সংশোধিত ব্যয় ৯ হাজার ৭৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কম। মূল লাইন নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন, ভবন নির্মাণ, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের পর ১৩ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়।
এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা
বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত একটি উড়াল শাখাসহ ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০১৯ সালে প্রকল্পটির ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
অর্থাৎ প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পে সরকারের অনুদান ১৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় নকশা ও দরপত্র প্রস্তুতিতে বিলম্ব এবং দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় কয়েকটি স্টেশনের আকার বাড়ানো হয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং ভেন্টিলেশন শ্যাফটের অবস্থান। রাজারবাগে তিনতলা স্টেশন নির্মাণের বিষয়টিও সংশোধিত পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ চলাকালে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক বা ডিটুর রোডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয় বেড়ে ৮৯ হাজার কোটি টাকা
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুট প্রকল্পের ব্যয়ও বড় অঙ্কে বেড়েছে।
প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়াবে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
প্রকল্পে সরকারের অনুদান ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা। অন্যদিকে জাইকার ঋণের পরিমাণ ১৩১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
প্রকল্পের হেমায়েতপুর-আমিনবাজার অংশ উড়ালপথে এবং আমিনবাজার-ভাটারা অংশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে পাতালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সংশোধিত প্রস্তাবে এর বাস্তবায়নকাল বাড়িয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
অন্য যেসব প্রকল্প অনুমোদন
একনেকে অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ৫টি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২টি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ২টি এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি করে প্রকল্প রয়েছে।
সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘রাজশাহী সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ের আরেকটি প্রকল্প ‘চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (৩য় পর্যায়)’ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১ হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বরিশাল সেনানিবাস, বরিশাল স্থাপন-২য় পর্যায়’ এবং ৩৭৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প (১ম সংশোধন)’ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ২৭০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন’ এবং অতিরিক্ত ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্প রয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কাজের উন্নত পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক প্রকল্প’ অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অতিরিক্ত ৫২ কোটি ৮১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আপগ্রেডেশন ও সম্প্রসারণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ১৫ প্রকল্প
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী এরই মধ্যে অনুমোদন দেওয়া ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ১৫টি প্রকল্পের বিষয়েও একনেককে অবহিত করেন।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন (২য় সংশোধিত), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ (১ম সংশোধিত), ভাসানচরে গ্রিন বেল্ট স্থাপন ও কক্সবাজারে বনায়ন, দেশি মুরগি গবেষণা, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন জোরদারকরণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত)।
এ ছাড়া জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন (রংপুর জোন) (১ম সংশোধিত), ৫ম তলা থেকে ১০ম তলা পর্যন্ত আরডিএ ভবন নির্মাণ, জালালাবাদ সেনানিবাস এসআইঅ্যান্ডটির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কোয়ার্টার গার্ড ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পও রয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছে বন্যা পূর্বাভাস সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সিলেট বিভাগের ডিজিটাল এলিভেশন (৩উ) মডেল প্রস্তুতকরণ (১ম সংশোধন), ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সৈয়দপুরের অবকাঠামো উন্নয়ন, মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুল, খুলনার অধিকতর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ‘স্ট্রেন্দেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইমপ্রুভড রিজিল্যান্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টারগেটিং (এসএসপিআইআরআইটি) (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্প।
এ ছাড়া বরগুনা জেলা স্টেডিয়ামের উন্নয়ন ও ডরমিটরি ভবন নির্মাণ, দিনাজপুর জেলা স্টেডিয়ামের অধিকতর উন্নয়ন ও ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং সিলেট-১০ নম্বর কূপ (অনুসন্ধান কূপ) খনন (২য় সংশোধিত) প্রকল্পও রয়েছে।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সড়ক পরিবহণ ও সেতু এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সরদার এম এ মুহিত, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।


