
নিজস্ব প্রতিবেদক | চেতনা একুশ:
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ঐতিহাসিক আবহে রাজধানীর রাজপথে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিশে গিয়ে দীর্ঘ প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি অংশ নেন বর্ণাঢ্য এই কর্মসূচিতে। নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত শোভাযাত্রায় তার উপস্থিতি ঘিরে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
প্রটোকল ও আনুষ্ঠানিকতার প্রচলিত দূরত্ব সরিয়ে রেখে রাজপথে সাধারণ মানুষের কাতারে হাঁটার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করেন তিনি। শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি গণমানুষের সঙ্গে তার এই অংশগ্রহণ দিবসটির উদযাপনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে খাল খননসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন, সেই স্মৃতির কথাও এদিন আলোচনায় উঠে আসে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত হওয়ায় রাজধানীসহ সারা দেশে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেন।
ঢাকা মহানগরী ছাড়াও বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে দেশজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার মধ্যে সংযোগ তুলে ধরে দিনটি উদযাপন করেন আয়োজকেরা।
নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ—জনস্রোতে রূপ নেয় শোভাযাত্রা
শনিবার বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এতে অংশ নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে শোভাযাত্রাটি পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে।
নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি কাকরাইল, হেয়ার রোড, মিন্টো রোড, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর ও ফার্মগেট অতিক্রম করে। পরে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে এটি জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পৌঁছায়।
দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর পর ২০০৫ সালের পর এই প্রথম এমন একটি বড় রাজনৈতিক গণশোভাযাত্রায় সরাসরি অংশ নিলেন তারেক রহমান। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। তিনি শুধু বিএনপির শীর্ষ নেতা নন, দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও শোভাযাত্রায় অংশ নেন। তার সঙ্গে একই সারিতে হেঁটেছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষার আহ্বান
শোভাযাত্রা শুরুর আগে নয়াপল্টনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধের মূল অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থার মানসিকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অধিকার সংকুচিত করার যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটে। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের বিনিময়ে মানুষ নিজেদের অধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছে এবং গণবিরোধী স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে।
বক্তব্যে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়ে যায়নি। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে।
এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার চেতনাকে যেকোনো মূল্যে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক চেতনা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে সমুন্নত রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের ওপরও তিনি জোর দেন।
শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে মুখরিত রাজপথ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ ও কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আমানউল্লাহ আমান এবং ফরহাদ হালিম ডোনার।
এ ছাড়া আহমেদ আজম খান, নুরুল ইসলাম মনি, আব্দুস সালাম, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষও এতে যোগ দেন। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো জনসমাগমে মুখর হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এই শোভাযাত্রা বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে রাজনৈতিক ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে তারেক রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল দিনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।


