
নিজস্ব প্রতিনিধি। চেতনা একুশ
জালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রাম জুবলী রোড শাখা থেকে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে। সাধারণ কর্মচারীকে ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারী সাজিয়ে ভুয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তাঁর স্ত্রীসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রুবেল হোসেন বাদী হয়ে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন। পরে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জালিয়াতির অভিনব কৌশল ও ভুয়া বিনিয়োগ চুক্তি
দুদক সূত্র জানায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের কর্মচারী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে কাগজে-কলমে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। জালিয়াতি চক্রটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাসিক ট্রেডিং’কে পণ্য সরবরাহকারী এবং ‘আরামিট সিমেন্ট লিমিটেড’কে পণ্য গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে।
এজাহারে বলা হয়েছে, বাস্তবে কোনো ধরনের পণ্য বা মালামাল সরবরাহ করা না হলেও ভুয়া বিল, ভাউচার ও কাগজপত্র তৈরি করা হয়। এসব জাল কাগজপত্র ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবলী রোড শাখায় জমা দিয়ে ২৭টি ভুয়া বাই-মুরাবাহা বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে মোট ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে উত্তোলন করা হয়।
মানি লন্ডারিং ও অর্থের উৎস গোপনের অপচেষ্টা
তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে তোলা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাধারণ উপায়ে আত্মসাৎ করেই ক্ষান্ত হননি আসামিরা। বরং সুকৌশলে সেই অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আত্মসাৎকৃত অর্থ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক হিসাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জমা করা হয়। অর্থের আসল উৎস ও গতিপথ সম্পূর্ণ আড়াল করার উদ্দেশ্যে এই মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ সংঘটিত করা হয়।
মামলার আসামিরা যারা
এই চাঞ্চল্যকর মামলায় সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ছাড়াও তাঁর স্ত্রী এবং আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামানকে আসামি করা হয়েছে। তালিকায় আরামিট গ্রুপের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁরা হলেন—প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ শাহ আলম, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) এ কে এম মারুফ এবং ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের কথিত মালিক ও আরামিট সিমেন্টের এজিএম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
এছাড়া জালিয়াতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগে ইসলামী ব্যাংকের জুবলী রোড শাখার আট জন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা হলেন—প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মহিউদ্দীন, প্রিন্সিপাল অফিসার (বিনিয়োগ) মোহাম্মদ আখতার হোসেন, প্রিন্সিপাল অফিসার ও জেনারেল ব্যাংকিং ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুল হক, ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জ ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আবদুল কাদের, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আবদুল করিম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জ মো. শহিদুল্লাহ, এফএভিপি ও ম্যানেজার অপারেশন মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, এসডিপি ও শাখা ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ এবং এসপিও রিদওয়ানুল হক।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা; ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা হবে এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


