
নিজস্ব সংবাদদাতা, চেতনা একুশ
দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাস-সংকটে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, রান্না ও পরিবহন খাতে ভোগান্তি বাড়ছিল। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় শিল্পকারখানাগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। তবে দীর্ঘ সংকটের মধ্যে স্বস্তির খবর এসেছে; সোমবার রাত ১০টা থেকে জাতীয় গ্রিডে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
এলএনজি আমদানি তদারক করে রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা। আর আমদানির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার আওতাধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত দিন এলএনজির কার্গো নিয়মিত না আসায় সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। এখন নতুন কার্গো আসা শুরু করায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে দীর্ঘদিন ধরে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এর মধ্যে গতকাল মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২৩৭ কোটি ঘনফুট। ওই সরবরাহের মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া যায় ৭৫ কোটি ঘনফুট।
সোমবার রাত ১০টা থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে ৯৮ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে ১৬২ কোটি ঘনফুট। ফলে সব মিলিয়ে দিনের মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুটে। এতে বিশেষ করে শিল্পকারখানায় চলমান গ্যাস-সংকট কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।
সেপ্টেম্বরে ৯টি এলএনজি কার্গো নিশ্চিত
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, চলতি সেপ্টেম্বরে মোট ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কটি কার্গো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শেষ পর্যন্ত চলতি মাসে মোট ৯টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের গানভর থেকে দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো থেকে দুটি এবং খোলাবাজার থেকে পাঁচটি কার্গো কেনা হয়েছে।
আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বরে আরামকোর দুটি এবং ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি কার্গো ইতিমধ্যে দেশে এসে এলএনজি সরবরাহ করেছে। সর্বশেষ সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পস্কোর একটি কার্গো থেকেও সরবরাহ শুরু হয়েছে।
আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের একটি করে কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। এসব কার্গো সময়মতো এলে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অক্টোবরের জন্যও শুরু হয়েছে এলএনজি কেনা
এদিকে আগামী অক্টোবর মাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি কার্গো কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অক্টোবরের জন্য ছয়টি কার্গো নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও পাঁচটি কার্গো সংগ্রহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত এলএনজি কার্গো দেশে আসতে থাকলে আগামী দিনগুলোতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে চলমান সংকট কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা
দেশে টানা প্রায় নয় বছর ধরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে সরকার।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি পরিচালনা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। টানা ২৫ দিনের তীব্র সংকটের পর গত ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি আবার পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হয়। তবে এরপরও এলএনজির নতুন কার্গো পর্যাপ্ত পরিমাণে না আসায় সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
চাহিদার তুলনায় কমছে এলএনজি কার্গো
সাধারণত দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আনা হয়। তবে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্গোর সংখ্যা কোনো কোনো মাসে কম-বেশি হয়ে থাকে।
গত বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশে মোট ২১টি এলএনজি কার্গো এসেছিল। অথচ চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে মাত্র ১৫টি। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনা চারটি কার্গো গত আগস্টে দেশে আসার কথা থাকলেও এর একটিও আসেনি। চলতি সেপ্টেম্বরেও এসব কার্গোর আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকেও বর্তমানে এলএনজি আসছে না। ফলে ঘাটতি পূরণে সরকারকে খোলাবাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহে সাম্প্রতিক অগ্রগতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস-সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেশীয় গ্যাসের ক্রমাগত উৎপাদন কমে যাওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আমদানির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য আমদানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি।


