
বিশেষ প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় আপাতত ভারত সফরে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় সফরটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। বিশেষ করে গঙ্গার পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং পারস্পরিক আস্থার মতো বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে মনে করছে ঢাকা।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন চুক্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান চুক্তি বহাল রাখার অনুরোধ জানালেও এখন পর্যন্ত দিল্লির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। পাশাপাশি সীমান্ত পরিস্থিতি, পুশইন, একজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সঙ্গে দিল্লি বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া ঘটনাসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় চলতি বছর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধার না হলে উচ্চপর্যায়ের সফর বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নিউইয়র্ক সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য টোকিও সফর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণের পর দুই দেশের মধ্যে সফর চূড়ান্ত করতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন কৌশলগত ভিত্তি পেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে জাপান ও সৌদি আরব সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের ভাষ্য, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগসহ বিভিন্ন ইস্যুর সমাধান ছাড়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করা কঠিন।
স্মরণযোগ্য যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত সরকার তাকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানায়। এরপর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে ভারত ও চীন—কোন দেশ আগে হবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী প্রথমে মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর করেন।
চীন সফরের পর ভারতীয় গণমাধ্যম ও বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একই সময়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগও সামনে আসে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় দিল্লি সফর স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত সরকারের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা মনে করেন, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানভিত্তিক সম্পর্কের পরিবেশ তৈরি হলেই ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের সফরের পথ সুগম হতে পারে।
এদিকে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, চলতি বছরের বাকি সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে নিউইয়র্ক, জাপান ও সৌদি আরবই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভবিষ্যতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতি হলে ভারত সফরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।


