Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

পঞ্চগড়ে জমি বিরোধের জেরে মূর্তি ভাঙার নাটক: সাম্প্রদায়িক উসকানির অপচেষ্টা নস্যাৎ

ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়

পঞ্চগড় প্রতিনিধি, চেতনা একুশ

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে প্রশাসন ও সচেতন এলাকাবাসী। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য— প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এবং ঘটনাকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে নিজেরাই মন্দির ও কালীমূর্তি ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


গত বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের জুগিকাটা এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিরোধের নেপথ্যে ৬ একর জমি

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এলাকার অনিল চন্দ্র রায়ের পরিবার এবং লক্ষ্মীচরণ রায়ের পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬ একর ৬৬ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। গত বছর লক্ষ্মীচরণ রায় ওই জমি স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেনের কাছে বিক্রি করেন, যা নিয়ে বর্তমানে আদালতে মামলা চলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আগামী ১২ জুলাই উভয়পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা বৈঠকের দিন ধার্য করেন এবং এর আগ পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ জমিতে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেন।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও সাজানো নাটক

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে বুধবার দুপুরে অনিল চন্দ্র ও তার লোকজন বিরোধপূর্ণ জমিতে চাষাবাদ করতে যান। এতে ক্রেতা জাকির হোসেন ও তার ভাই জুলকার রানা বাধা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। একপর্যায়ে জাকিরকে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করা হয়।


পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মারধরের পর বিরোধপূর্ণ জমির পাশে কয়েক মাস আগে তৈরি করা একটি অস্থায়ী খড়ের ঘর ও কালীমূর্তি নিজেরাই ভেঙে ফেলা হয়। এরপর গুরুতর আহত জাকিরের হাতে ও গলায় সেই ভাঙা মূর্তি ধরিয়ে দিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানির চেষ্টা চালানো হয়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় জাকিরকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয়দের বক্তব্য ও প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি

লক্ষ্মীচরণ রায়ের স্ত্রী শেফালী রানী স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

‘অনিলরা আগে জাকিরকে মারধর করে। পরে তারাই কালীমূর্তি ভেঙে নাটক সাজিয়েছে। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে এবং জমি দখলের উদ্দেশ্যে তারা মুসলিমদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।”

আহত জাকিরের ভাই জুলকার রানা জানান, “ইউএনও সাহেবের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও তারা জমি চাষ করতে এলে আমরা বাধা দিই। তারা আমার ভাইকে মেরে পা ভেঙে দিয়েছে এবং নিজেরাই মূর্তি ভেঙে ভিডিও বানিয়ে গুজব ছড়িয়েছে। ভিডিওটি দেখলেই সত্যতা বোঝা যায়।”
অন্যদিকে অনিল চন্দ্র রায়ের ভাই কান্তপাল রায় জমি চাষে বাধার কথা স্বীকার করলেও মূর্তি ভাঙার দায় জাকিরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন।

প্রশাসনের শক্ত অবস্থান ও শান্তিপূর্ণ সমাধান

আটোয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু নয়, বরং নিছকই জমি-সংক্রান্ত বিরোধ। মুসলিম যুবকের মূর্তি ভাঙার দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী জানান, প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি: বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে আটোয়ারী প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উভয়পক্ষই স্বীকার করেন যে, ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে তারা নিজেদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধটি শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করে নিয়েছেন।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ