Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

মা দিবস : মায়ের জন্য ভালোবাসা হোক বছরের প্রতিটি দিনে

পরম নির্ভরতার আশ্রয়স্থল মায়ের কোল

‘মা’— এক অক্ষরের ছোট শব্দ, যার গভীরতা মাপার সাধ্য পৃথিবীর কোনো মানদণ্ডের নেই। জন্মের আগে থেকেই যিনি সন্তানের জন্য বুনতে থাকেন পরম মমতার চাদর, তিনিই মা। এই একটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ত্যাগ আর অগাধ মমতা। সন্তানের হাসি, কান্না, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ ঘিরেই আবর্তিত হয় মায়ের পুরো জীবন। সন্তানের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি সফলতায় আর নিরাপদ আশ্রয়ে মিশে থাকেন তিনি। মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কোনো প্রতিদান হয় না, কিন্তু তাঁর প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও সময়টুকু দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই প্রশ্ন জাগে— মাকে ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কি সত্যিই আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন আছে?

বিশ্বজুড়ে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। আধুনিক এই করপোরেট পৃথিবীতে নানা বিশেষ দিবসের ভিড়ে আবেগও যেন আজ অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় বন্দি। কিন্তু আধুনিক সংস্কৃতির যুগে কেবল মে মাসের একটি নির্দিষ্ট রবিবার কি মায়ের জন্য যথেষ্ট? এই প্রশ্নটিই আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে একজন সন্তানের কাছে প্রতিটি দিনই মা দিবস। মায়ের জন্য ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বিষয় নয়; এটি প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা অনুভূতি। যারা সারা বছর মায়ের খোঁজ নিতে ভুলে যায়, হয়তো বিশেষ একটি দিনের প্রয়োজন তাদেরই বেশি পড়ে। কিন্তু যাদের হৃদয়ে মা প্রতিদিনের অনুভব, তাদের কাছে মাকে ভালোবাসার আলাদা দিন বলে কিছু নেই।

বিশ্বজুড়ে ‘মা দিবস’ পালনের ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু করে আধুনিক আমেরিকা— নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন দিনটিকে জাতীয় মর্যাদা দেন এবং ১৯৬২ সালে এটি বৈশ্বিক রূপ পায়।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য ছিল শান্তি এবং মাতৃত্বের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। অথচ বর্তমান সময়ে দিবসটি অনেক ক্ষেত্রেই কেবল আনুষ্ঠানিকতা আর উপহার আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জায়গা থেকেও মায়ের স্থান সবার উপরে। ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে সনাতন ধর্ম এবং উপনিষদেও মাকে দেবীর আসনে বসানো হয়েছে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও মা এক চিরন্তন প্রেরণা। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে মাকে ঘিরে অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি রয়েছে। শিল্পীরা তাদের আবেগ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন গান, কবিতা আর গল্পে। কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখনীতে মায়ের মমতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্য মহিমায়। আধুনিক সংগীতের জগতেও জেমস কিংবা নচিকেতার গানে মায়ের প্রতি সন্তানের হাহাকার ও ভালোবাসা বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা দিবস পালনের চিত্রও বৈচিত্র্যময়।

• সুইডেনে শিশুরা প্লাস্টিকের ফুল বিক্রি করে মাকে রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়,

• জাপানে শিশুরা মায়ের ছবি এঁকে প্রদর্শনী করে,

• মেক্সিকোতে চলে উৎসবের আমেজ।

• তবে যুগোস্লাভিয়ার রীতি কিছুটা অদ্ভুত; সেখানে উপহার না পাওয়া পর্যন্ত মাকে বেঁধে রাখার এক মজার প্রথা চালু আছে।

এত আয়োজনের ভিড়ে একটি রূঢ় বাস্তবতা আমাদের ব্যথিত করে— তা হলো বৃদ্ধাশ্রম। যে মা নিজের জীবনের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বড় করেছেন, শেষ বয়সে সেই মায়ের স্থান যখন চার দেয়ালের নির্জন কক্ষে হয়, তখন পুরো সমাজের বিবেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

যাদের মা বেঁচে আছেন, তারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান। আর যারা মাকে হারিয়েছেন, তারাই সবচেয়ে ভালো জানেন— মায়ের শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না।

তাই মা দিবস যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। মায়ের পাশে থাকা, তার কষ্ট বোঝা, তাকে সময় দেওয়া এবং সম্মান করাই হোক প্রকৃত মা দিবসের চেতনা।

পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আর যেসব মা নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় সন্তানকে আগলে রেখেছেন, স্রষ্টা যেন তাদেরও সেভাবেই আগলে রাখেন।

তাই বছরের একটি দিন নয়, বরং মায়ের প্রতি ভালোবাসা হোক ৩৬৫ দিনের। ক্যালেন্ডারের পাতায় নির্দিষ্ট কোনো তারিখে আটকে না থেকে সন্তানের প্রতিটি কাজ আর শ্রদ্ধায় প্রতিদিন বেঁচে থাকুক মা দিবস। প্রতিটি সন্তান যেন মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর অঙ্গীকার নিয়ে দিন শুরু করে— এটাই হোক আজকের দিনের প্রত্যাশা।

লেখক : এড্. নাসরিন বেগম, সহ-সম্পাদক, চেতনা একুশ

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ