
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
খুলনা সরকারি ইকবাল নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী আরফান হোসেন নির্জনা (১৬) হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ও নির্মম সত্য বেরিয়ে এসেছে। নিজের আপন কন্যাকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মা সীমা আক্তার। গতকাল শুক্রবার (১০ জুলাই) খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিম তার এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত আসামিকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এর আগে গত বুধবার রাতে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা থেকে পুলিশ নির্জনার রক্তাক্ত ও বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেছিল।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, জবানবন্দিতে নির্জনার মা সীমা আক্তার ঘটনার দিনের নির্মম বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন বিকেলে কোনো একটি বিষয় নিয়ে মেয়ের সঙ্গে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মেয়েকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন। ঘরের ভেতর এমন শোরগোল ও চিৎকার শুনে নির্জনার বাবা আলীম হোসেন আকাশ সেখানে ছুটে আসেন এবং উভয়কে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। তবে মেয়ে নির্জনা চুপ না করে প্রতিবাদ চালিয়ে গেলে, বাবা চরম উত্তেজিত হয়ে একটি ভারী কাঠের চলা (লাকড়ি) দিয়ে মেয়ের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এই মারাত্মক আঘাতের ফলেই ঘটনাস্থলে নির্জনার মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে এরপর নির্জনার বাবা ঘরে থাকা একটি ছেঁড়া লুঙ্গি ও প্লাস্টিকের বস্তায় মেয়ের মরদেহটি শক্ত করে বাঁধেন। পরবর্তীতে নিজের মোটরসাইকেলে সেই বস্তাবন্দি লাশ বেঁধে নিরালার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে দিয়ে আসেন।
অনুসন্ধানে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ জানা গেছে। পরিবারের অমতে তেরখাদা আজগড়া এলাকার এক যুবকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় নির্জনার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিল তার পরিবার। গত ২১ এপ্রিল আরফান হোসেন নির্জনা সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমানকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের ১৭ দিন পর পরিবার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনে। ঘটনার দিন সকালেও মেয়েটি পুনরায় তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলে, তাকে আবারও বুঝিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই দিন বিকেলেই পারিবারিক এই ক্ষোভ রূপ নেয় চরম ট্র্যাজেডিতে।
এদিকে খুলনা সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই নির্জনার বাবা মো. আলীম হোসেন আকাশ সম্পূর্ণ পলাতক রয়েছেন। তাকে আইনের আওতায় আনতে এবং তার অবস্থান নিশ্চিত করতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে জোরদার অভিযান চালাচ্ছে।
শুক্রবার সকালে নির্জনার মা সীমা আক্তার স্বেচ্ছায় এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে রাজি হলে দুপুরের পর তাকে আদালতে তোলা হয়। এর আগে, সকালে সদর থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সদর দপ্তরে একটি বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে কেএমপি কমিশনার এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরবেন।


