
পাবনা প্রতিনিধি, চেতনা একুশ
পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে স্থানীয় জনতা। বিক্ষুব্ধ লোকজন বাড়িটির দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি বড় হাতুড়ি দিয়ে ভবনের বিভিন্ন অংশে আঘাত করেন। একপর্যায়ে দোতলা বাড়িটির বড় একটি অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর দুপুর থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত পাবনা সদর উপজেলার ওই বাড়িতে এ ভাঙচুর চলে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজ শেষে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ওই বাড়ির সামনে জড়ো হতে থাকেন। পরে তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় বাড়িতে থাকা লোকজন পুলিশের সহায়তায় সরে যান। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়িটিতে ভাঙচুর শুরু করে।
বিক্ষোভকারীরা বাড়ির আসবাবপত্র, দরজা-জানালা ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলেন। বড় হাতুড়ি দিয়ে ছাদেও আঘাত করতে দেখা যায়। এতে দোতলা বাড়িটির অবকাঠামোর বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে আগে থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে গ্রামবাসীর তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙচুর ঠেকানো সম্ভব হয়নি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি বলেন, জুমার নামাজের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে সেখানে জড়ো হন। তারা একত্র হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে বাড়ির লোকজন পুলিশের সহায়তায় সরে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দেয়াল পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন দোতলা বাড়িটি অনেকটা কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
যেভাবে নিখোঁজ হয় শিশুটি
গত ৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ শ্রেণির ওই শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, সেদিন বিকেলে শিশুটি তার বাবার সঙ্গে স্থানীয় একটি বাজারে যায়। বাজার শেষে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে বাজারের ব্যাগ মায়ের হাতে দিয়ে আবার বাড়ি থেকে বের হয় সে। এরপর আর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে শিশুটির একটি স্যান্ডেল পাওয়া যায়। এ ঘটনায় পরদিন শিশুটির বাবা পাবনা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
শিশুটির সন্ধান চেয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শহরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন তার স্বজন, সহপাঠী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। একই দিন শিশুটির বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে অপহরণের মামলা করেন।
এর পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন বিকেলেই পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে শিশুটির বাবার করা মামলায় হত্যা ও ধর্ষণের ধারা যুক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিক (৫৫) এবং তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলী (২১)। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
পুলিশ যা বলছে
বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, মোস্তফা প্রামাণিক একজন মুদি দোকানি। পুলিশ বলছে, মোস্তফা ও তার বাড়ির ভাড়াটিয়া ইয়াছিন শিশুটিকে হত্যার আগে মুদি দোকানের পেছনে নিয়ে ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সুপার জানান, ঘটনা আড়াল করতে মোস্তফা ও ইয়াছিন শিশুটিকে খোঁজার নাটকও করেন। পরে মোস্তফা মরদেহটি বাড়ির একটি খাটের নিচে রেখে দেন। এরপর মরদেহ খণ্ডিত করে বস্তায় ভরে তাতে দুটি ইট বেঁধে বাড়ির পাশের ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ডোবা থেকে মরদেহ তুলে সেপটিক ট্যাংকে ফেলার চেষ্টা করেন তারা। তবে দুর্গন্ধের কারণে কুকুরের দল সেখানে চলে আসায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে মরদেহটি ডোবাতেই পড়ে থাকে। স্থানীয় লোকজন থানায় খবর দিলে পুলিশ গিয়ে সেটি উদ্ধার করে।
ময়নাতদন্তে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই ধর্ষণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন স্থানীয়রা
১০ বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণের পর এভাবে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই শুক্রবার বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালান।
ভাঙচুরে অংশ নেওয়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, শিশুটিকে যারা ধর্ষণ ও হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা দেখতে চান তারা। ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানান তারা।
তাদের ভাষ্য, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দৃশ্যমান বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তবে আসামিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিই তাদের মূল প্রত্যাশা।


