
নিজস্ব প্রতিবেদক । চেতনা একুশ
ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিদায় নেওয়া স্বৈরাচারী শক্তির দোসররা এখনো পর্দার আড়াল থেকে দেশের বিরুদ্ধে নানামুখী চক্রান্তের জাল বুনছে বলে দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত ৫ আগস্টে বিতাড়িত শক্তির সঙ্গে একটি বিশেষ মহলের গোপন আঁতাত ও গভীর মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি যেকোনো মূল্যে এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ঐতিহাসিক ধরার খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিগত ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে পতিত স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়েও ষড়যন্ত্র থামায়নি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের ভেতরে থাকা একটি গোষ্ঠী গোপনে সেই স্বৈরাচারী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তাদের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের সংকটের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সে সময় যখন সাধারণ মানুষ বিপদে পড়েছিল, তখন বিএনপির আইনজীবী ও চিকিৎসকরাই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অথচ আজ যারা নানা দাবিতে আন্দোলন ও অবরোধ সৃষ্টি করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাইছে, সংকটের সেই দিনগুলোতে তাদের মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “যারা আজ দেশে বিভ্রান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, তারা কিন্তু দেশের প্রান্তিক কৃষকের কথা বলে না, খাল খনন বা গ্রামীণ জনপদের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা।”
ধরার খালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও কৃষি বিপ্লব
ত্রিশালের ধরার খালের গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “ধরার খাল কেবল একটি জলাশয় নয়, এটি এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও জীবন-জীবিকার চালিকাশক্তি। দীর্ঘদিন ভরাট হয়ে থাকায় কৃষকরা সেচ সংকট ও জলাবদ্ধতার মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় ৪৫ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজে এই খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।” এ সময় উপস্থিত ষাটোর্ধ্ব প্রবীণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে।
তিনি জানান, এই পুনঃখনন প্রকল্প সম্পন্ন হলে স্থানীয় ৪ হাজার ৩০০ কৃষক সরাসরি সুফল পাবেন এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনে ইতিবাচক অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসবে।
তৃণমূলের শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যের উন্নয়ন
কৃষি খাতের পাশাপাশি শিক্ষাখাতে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় নতুন স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে এই সামগ্রী বিতরণ করা হবে। গ্রামীণ শিশুরা যেন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্কুলে যেতে পারে, সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সব মসজিদের ইমাম-খতিব, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং অন্যান্য সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমাজে নৈতিকতা বজায় রাখতে যারা অবদান রাখছেন, তাদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। আধুনিক টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজকে দক্ষ করে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।”
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “এ দেশের আপামর জনতা রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে হটিয়ে তাদের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছে। মানুষ এখন উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তন চায়। বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে আজ দেশের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। নতুন অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ করে একটি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”
ত্রিশালের এই বর্ণাঢ্য জনসভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন, ত্রিশাল আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও প্রান্তিক কৃষক।


