
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম বাজেট প্রণয়ন ও আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দল ঐকমত্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি দলের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো বাজেটে বিরোধী দল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং দেশ গঠনের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের মূল্যায়ন হয়েছে। কেউ এটিকে ইতিবাচক বলেছেন, আবার কেউ সমালোচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত এই প্রথম বাজেটে বিরোধী দল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, সংসদের নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলের জন্য ২৬ শতাংশ সময় বরাদ্দ থাকলেও এবার তাদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়। ফলে তারা প্রায় ৩১ শতাংশ সময় বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন। বিরোধী দলের সদস্যরা ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য দেন এবং বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের ক্ষেত্রেও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সাধারণত বাজেট আলোচনার নির্ধারিত সময় শেষে সরকার গিলোটিন প্রস্তাব আনে। কিন্তু এবার বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই স্পিকারের কাছে গিলোটিন প্রস্তাব আনার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে বিরোধী দল তাদের ছাঁটাই প্রস্তাবও প্রত্যাহার করে নেয়। এর মাধ্যমে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে বাজেট নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাইকেল পার্টসের ওপর করছাড়ের দাবি ছাড়া বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য আর কোনো দাবি ছিল না। সেই দাবিও প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে বিবেচনার নির্দেশ দেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশের উন্নয়ন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
চিফ হুইপের দাবি, অতীতে বাজেটকে কেন্দ্র করে মিছিল, বিক্ষোভ, বর্জন বা তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার ঘটনা ঘটলেও এবার তেমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি বাজেট ঘোষণার আগে কিংবা বাজেট পাসের পরও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা যায়নি।
‘জীবনবান্ধব বাজেট’ বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার
চিফ হুইপ বলেন, সরকার চায় যেসব পণ্যে কর কমানো হয়েছে, সেগুলোর দামও যেন কমে। এ লক্ষ্যে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কোনো নতুন কর আরোপ করা হয়নি। বরং যেসব পণ্যে আগে ৫ শতাংশ কর ছিল, তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় সব খাতকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী এটিকে বাস্তব অর্থেই একটি জীবনবান্ধব বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অর্থপাচার ও দুর্নীতি রোধে জোর
সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ বলেন, অনেকে প্রশ্ন তুলছেন এত করছাড় দিয়ে সরকার কীভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করবে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থপাচার বন্ধ করা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে বাজেট বাস্তবায়নে অর্থসংকটের বড় অংশই দূর করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। একসময় হঠাৎ করেই ডলারের দাম বেড়েছে, একাধিক ব্যাংক সংকটে পড়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিতে হয়েছে। অতীতের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মেগা প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব এখনও অর্থনীতিতে বিদ্যমান।
এ কারণে সরকার শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়, দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে সেচের জন্য পানির নিশ্চয়তা এবং দেশের পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ জানান, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ২৫ কোটি গাছ রোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, কৃষক কার্ড, পরিবার কার্ড, নারীদের জন্য বিশেষ কার্ড, প্রবাসীসেবা এবং স্বাস্থ্য খাতের নানা কর্মসূচি। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে কোনো মানুষ অভুক্ত থাকবে না এবং সবাই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুও উপস্থিত ছিলেন।


