Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

ইসলামী ব্যাংকের সংকট ও গ্রাহকের দুর্ভোগ: আস্থা ফেরানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ

দেশের ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে বিতর্ক, শীর্ষ পদে আকস্মিক পরিবর্তন এবং তার জের ধরে তৈরি হওয়া তীব্র তারল্য সংকট ব্যাংকটিকে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে। আর এই ত্রিমুখী সংকটের চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের, যাঁদের রক্তঘাম করা উপার্জনের আমানত এই ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে।

​গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইসলামী ব্যাংকের শাখাগুলোতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন এবং চরম ভোগান্তির চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এটিএম বুথে নগদ টাকার অভাব, বড় অঙ্কের চেক ভাঙাতে না পারা, কিংবা অনলাইন লেনদেনে জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসার খরচ, মেয়ের বিয়ে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কিংবা দৈনন্দিন ব্যবসার জরুরি প্রয়োজনেও মানুষ নিজের হিসাব থেকে চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন না। ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের এই যে সাময়িক ‘আস্থার সংকট’ তৈরি হয়েছে, তার ফলেই হুড়োহুড়ি করে আমানত তুলে নেওয়ার একটি হিড়িক লক্ষ্য করা গেছে, যা তারল্য সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

​পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কঠোর ও দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকের বিতর্কিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালককে এর দায়িত্ব অর্পণ করার সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী। একই সঙ্গে, চেক ক্লিয়ারিং ও নগদ অর্থের জোগান স্বাভাবিক করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার এই জোরালো হস্তক্ষেপ ও আশ্বাস গ্রাহকদের মনে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, মাঠপর্যায়ে ভোগান্তি পুরোপুরি দূর হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

​তবে মনে রাখতে হবে, কেবল সাময়িক অর্থ ধার দিয়ে বা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইসলামী ব্যাংক দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের এক বিশাল অংশ (প্রায় ৮.৭ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এই ব্যাংকের স্থিতিশীলতার সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ জড়িত। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনকে অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বের ছায়া যেন এই ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

​আমরা আশা করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তায় ইসলামী ব্যাংক দ্রুতই তার স্বাভাবিক গৌরব ও কার্যক্রমে ফিরে আসবে। শাখাগুলোতে নগদ টাকার প্রবাহ নিশ্চিত করে গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন করাই এখন প্রধান কাজ হওয়া উচিত। ব্যাংকিং খাতের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখতে হবে, যাতে আর কোনো সাধারণ গ্রাহককে নিজের জমানো টাকা তোলার জন্য ব্যাংকের বারান্দায় দীর্ঘ অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলতে না হয়। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনার এই পরীক্ষায় সফল হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ