বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও সংবেদনশীল ইস্যু হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অনিয়ন্ত্রিত ও লাগামহীন বিকাশ। এটি আর কেবল প্রযুক্তির উৎকর্ষতার অনুষঙ্গ নয়, বরং মানব সভ্যতার অস্তিত্ব, বিশ্ব রাজনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অভূতপূর্ব ও আসন্ন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়ো তথ্য ও ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতি ও নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করা, লাখ লাখ মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান বিলুপ্তির ঝুঁকি এবং স্বয়ংক্রিয় সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কা বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এই প্রযুক্তিকে একটি কঠোর আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এআই চিকিৎসা বিজ্ঞান, মহাশূন্য গবেষণা এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে—এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এই গগনচুম্বী সম্ভাবনার আড়ালে যে অন্ধকূপ তৈরি হচ্ছে, তার ভয়াবহতা অনেক বেশি। জেনারেটিভ এআই যেভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে হুবহু অনুকরণ করছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের চেনা কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।
বিশেষ করে, নিখুঁত ভুয়ো ছবি ও কণ্ঠস্বর তৈরির প্রযুক্তি সত্য আর মিথ্যার দেয়ালকে মুছে দিচ্ছে, যা যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে। অন্যদিকে, উৎপাদন ও সেবা খাত থেকে শুরু করে মেধাভিত্তিক পেশাগুলোতে যেভাবে মানুষের বিকল্প হিসেবে এআই-কে বসানো হচ্ছে, তাতে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল বেকারত্ব ও চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
প্রযুক্তির এই আগ্রাসী ধারাকে পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি একে সম্পূর্ণ লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়াও হবে আত্মঘাতী। যেভাবে অতীতে পারমাণবিক প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বৈশ্বিক চুক্তি ও কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এআই-এর নৈতিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে বিশ্বের পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে এক টেবিলে বসতে হবে।
প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প বা নিয়ন্তা হতে পারে না; একে থাকতে হবে মানুষের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে। আজ যদি আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর কঠোর মানবিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হই, তবে মানব ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারই একদিন মানব সভ্যতার পতনের প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য হবে।
ডক্টর মুহাম্মদ হায়দার আলী, সম্পাদক


