
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
ই-টিন (e-TIN) থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে—সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে অনেক করদাতার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিল না করলেই সবার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের নিয়ম নেই। করদাতার পরিস্থিতি, পূর্ববর্তী আয় নির্ধারণ এবং আইনগত বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন জমা দিতে হবে?
বিভিন্ন প্রয়োজনে অনেকেই ই-টিন নিবন্ধন করেন। ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ, ঋণ নেওয়া কিংবা জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধনের মতো কাজে ই-টিন প্রয়োজন হতে পারে। তবে ই-টিন নেওয়ার পর আয় কমে গেলে কিংবা আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে এলেও সব ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।
কর আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতাদের জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। যাদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে, তাদের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অন্যান্য ব্যক্তিকেও রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।
এ ছাড়া কোনো ফার্মের অংশীদার, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক, নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মচারী ও সরকারি চাকরিজীবীসহ আইন দ্বারা নির্ধারিত ব্যক্তিদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ কিংবা আইনগত প্রয়োজনে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণও দেখাতে হয়।
তাই শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে এসেছে কিংবা বর্তমানে আয় নেই—এমন যুক্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান যাচাই করা জরুরি।
রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬(১) অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ সবার জন্য সমান নয়। করদাতার পরিস্থিতি এবং আগে তাঁর আয় নিরূপণ করা হয়েছিল কি না, তার ওপর জরিমানার সীমা নির্ভর করে।
আইনের বিধান অনুযায়ী, আগে আয় নিরূপণ করা হয়নি—এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা হতে পারে।
অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ করা হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—এ দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেটি জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে প্রযোজ্য হতে পারে।
এ ছাড়া নির্ধারিত ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানাও আরোপ করা হতে পারে।
অর্থাৎ, ই-টিন থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকে রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে সরাসরি ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে আইনগত শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট করদাতার পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়।
ব্যক্তি করদাতাদের রিটার্ন জমার শেষ সময় কখন?
সাধারণত স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত সময় ৩০ নভেম্বর। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সময়সীমা বাড়াতে পারে।
এ কারণে করদাতাদের রিটার্ন জমার নির্ধারিত সময় সম্পর্কে হালনাগাদ নির্দেশনা জেনে নেওয়া উচিত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম এবং সময়সীমা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আয় নেই, করও দিতে হচ্ছে না—করণীয় কী?
অনেকের ই-টিন থাকলেও বর্তমানে কোনো আয় নেই। আবার কারও আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকায় আয়কর দিতে হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমেই যাচাই করতে হবে, বর্তমান আইন অনুযায়ী তাঁর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না।
যদি ভবিষ্যতে রিটার্ন দাখিলের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে টিআইএন বাতিলের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে আবেদন করলেই টিআইএন বাতিল হয়ে যাবে, এমন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, টিআইএন বাতিলের বিষয়টি এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এক নয়। কোনো করদাতার টিআইএন থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে।
অনলাইনে যেভাবে রিটার্ন জমার অবস্থা যাচাই করবেন
নিজের ই-টিনের বিপরীতে অতীতে কোন কোন করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছে, তা অনলাইনে যাচাই করা সম্ভব। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করতে হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট করবর্ষগুলোর রিটার্ন দাখিলের তথ্য এবং জমা দেওয়ার প্রমাণ বা প্রাপ্তিস্বীকারপত্র রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো করবর্ষের রিটার্ন বাকি থাকলে প্রযোজ্য আইন ও নিয়ম অনুসারে তা দাখিলের ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ছাড়া রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে জরিমানার নোটিশ পেলে সেটি উপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে যোগাযোগ করা উচিত। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কর আইনজীবীর পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।
গুজবে আতঙ্ক নয়, নিজের কর-অবস্থা যাচাই করুন
ই-টিন থাকলেই রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে সবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, আয়কর আইন অনুযায়ী জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধান ও শর্ত রয়েছে।
তবে জরিমানা সবার ক্ষেত্রে এক নয় বলে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। নিজের আয়, ই-টিনের অবস্থা, পূর্ববর্তী রিটার্ন দাখিলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষের বিধান যাচাই করে সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


