Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

ঈদে মিলাদুন্নবী: নবীপ্রেম, ঈমানি প্রেরণা ও মহানবীর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান

নাসরিন বেগম, সহ-সম্পাদক, চেতনা একুশ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বিশ্বের জন্য ঈমানি প্রেরণা ও আনন্দের বার্তা নিয়ে প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে ফিরে আসে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারীদের কাছে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমন স্মরণে মুসলমানরা এ দিনটি যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করেন।

মানুষ স্বভাবতই কোনো নেয়ামত বা রহমত লাভ করলে আনন্দ প্রকাশ করে। পবিত্র কোরআনেও আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের কারণে আনন্দ প্রকাশের নির্দেশনা রয়েছে। সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণেই তারা আনন্দিত হোক।’ তাফসিরকারদের ব্যাখ্যায় এ আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের তাৎপর্য হিসেবে ইসলাম ও আল-কোরআনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঈদে মিলাদুন্নবী কী

‘ঈদ’ অর্থ আনন্দ বা খুশি প্রকাশ করা। আর ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বেলাদত বা শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশকে বোঝানো হয়। মুসলমানরা এ উপলক্ষে মহানবীর জন্ম ও জীবন, তাঁর আদর্শ, বাণী ও শিক্ষা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ ও সালাম পাঠ, মিলাদ মাহফিল, ওয়াজ-নসিহত ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশে দিনটি সাধারণত ‘মিলাদুন্নবী’ নামে পরিচিত। অন্য অঞ্চলে এটি ‘নবী দিবস’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।

ঈদে মিলাদুন্নবীর ইতিহাস

পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এ দিনে বিশ্বনবীর শুভাগমন স্মরণ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা নাতে রাসুল, জশনে জুলুস, মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

ঐতিহাসিকভাবে মিলাদুন্নবী পালনের প্রচলন কয়েক শতাব্দী আগে শুরু হয়। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এর আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ইরাকের ইরবিল অঞ্চলের শাসক আবু সাঈদ কুকবুরীর সময় আনুষ্ঠানিকভাবে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে। মিলাদ বিষয়ে প্রাচীন গ্রন্থ রচনাকারীদের মধ্যে আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল-কালবীর নাম উল্লেখযোগ্য।

যেসব দেশে পালিত হয়

মূলধারার সুন্নি ও শিয়া মুসলিমসহ ইসলামের বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারীরা বিভিন্ন দেশে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, ইরাক, মিশর, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, সুদান, তিউনিসিয়া, ইয়েমেনসহ বহু দেশে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়ে থাকে। কয়েকটি দেশে এ উপলক্ষে সরকারি ছুটিও থাকে।

তাৎপর্য ও ফজিলত

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত মুসলমানের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন মুমিনের কাছে তিনি তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও অন্য সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ ঈমান অর্জিত হবে না।

মহানবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ হলো তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা। পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।’

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসুলের আনুগত্য কর, তাহলে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হবে।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৩২)

এ ছাড়া সূরা আহজাবের ২১ নম্বর আয়াতে মহানবীকে মুসলমানদের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ঈদে মিলাদুন্নবীর মূল শিক্ষা শুধু আনন্দ প্রকাশে সীমাবদ্ধ না রেখে মহানবীর জীবনাদর্শ অনুসরণ ও তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

এ দিনে যা করা হয়

বাংলাদেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে মিলাদুন্নবী, জশনে জুলুসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এসব আয়োজনে মহানবীর শান, মর্যাদা ও জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ ও সালাম পাঠ, তাওয়াল্লুদ, নাতে রাসুল, ওয়াজ-নসিহত এবং দোয়া-মোনাজাত করা হয়।

এ ছাড়া স্মরণসভা, আলোচনা সভা, সেমিনার, কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে মহানবীর জীবন, শিক্ষা ও আদর্শ তুলে ধরা হয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মহানবীর জীবন ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণে অনুপ্রাণিত হয়।

বাংলাদেশে উদযাপন

বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়। মসজিদ, মাদরাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক পরিবারেও কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, দরুদ পাঠ ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এ উপলক্ষে দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়ে বাণী দিয়ে থাকেন। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং টেলিভিশন ও বেতারে এ দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমেও ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি আয়োজনের প্রচলন রয়েছে।

ঈদে মিলাদুন্নবীর মাসে মহানবীর প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করার পাশাপাশি তাঁর আদর্শ, শিক্ষা ও সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করা জরুরি। তাঁর জীবনাদর্শ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এই পবিত্র দিনের প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রিয় নবীর আদর্শ অনুসরণ করে ইহকাল ও পরকালে সফলতা অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ