
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যে সামাজিক ব্যাধিটি সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো দেশজুড়ে ‘কিশোর গ্যাং’ বা কিশোর অপরাধী চক্রের ভয়াবহ বিস্তার। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের জেলা-উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এই গ্যাং সংস্কৃতির বিষাক্ত থাবা ছড়িয়ে পড়েছে। পাড়া-মহল্লায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, সাধারণ মানুষকে হয়রানি, ইভটিজিং থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এই প্রবণতা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই ঘটাচ্ছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তুলছে।
আগে কিশোর অপরাধের ধরন যেখানে ছিল মূলত স্কুল ফাঁকি বা ছোটখাটো অবাধ্যতা, এখন তা রূপ নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও সংঘবদ্ধ অপরাধে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে এক গ্যাং অন্য গ্যাংয়ের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেক কিশোর।
এই সর্বনাশা সংকটের নেপথ্যে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক নজরদারির অভাব, সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার মাঠের সংকট, অতিরিক্ত স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট আসক্তি এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাব কিশোরদের এই অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—স্থানীয় একশ্রেণির তথাকথিত ‘বড় ভাই’ বা স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এই অবুঝ কিশোরদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করছে। এই রাজনৈতিক ও স্থানীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ই কিশোর গ্যাংগুলোকে আরও বেশি বেপরোয়া ও হিংস্র করে তুলছে।
কিশোর গ্যাং নামের এই সামাজিক ক্যান্সার থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে হলে কেবল পুলিশি অভিযান বা আইনি কঠোরতা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি বহুমুখী ও টেকসই সামাজিক প্রতিরোধ:
- পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা: সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, তার আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসছে কি না—সেদিকে মা-বাবাকে কঠোর নজর রাখতে হবে। পরিবারই হোক নৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা।
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ‘বড় ভাই’দের চিহ্নিতকরণ: কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই গডফাদার বা ‘বড় ভাই’দের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করা জরুরি।
- সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা, পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার স্থাপন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে কিশোরদের উদ্বৃত্ত শক্তি ইতিবাচক দিকে ধাবিত হয়।
- আইনি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংশোধন: কিশোর অপরাধীদের সাধারণ অপরাধীদের সাথে জেলে না রেখে, সংশোধনাগারের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। সেখানে তাদের যথাযথ মানসিক কাউন্সিলিং এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। সেই তরুণদের একাংশ যদি এভাবে অপরাধের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে। আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি হতে দেখতে চাই না, কোনো কিশোরের জীবন অপরাধের গহ্বরে নষ্ট হতে দিতে চাই না। এখন আর কালক্ষেপণ করার সময় নেই, এখনই চূড়ান্ত আঘাত হানার সময়।
ডক্টর মুহাম্মদ হায়দার আলী, সম্পাদক, চেতনা একুশ।
