
নিজস্ব প্রতিবেদক । চেতনা একুশ
দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে অবিশ্বাস্য উপায়ে ৫ লাখ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানান, এই বিশাল অঙ্কের অর্থের সিংহভাগই ইতিমধ্যে দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে।
শনিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে গভর্নর এই রূঢ় সত্য তুলে ধরেন।
গভর্নর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমের এক-তৃতীয়াংশ টাকাই এখন গায়েব। যেটাকে আমরা তথাকথিত ‘ভদ্র ভাষায়’ খেলাপি ঋণ বলছি, আসলে তা স্পষ্টতই চুরি। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, এই বিশাল পরিমাণ চুরির বিপরীতে ব্যাংকে কোনো ধরনের জামানত রাখা হয়নি।”
অর্থ আদায়ে ‘অ্যাসেট রিকোভারি’র ওপর জোর
লুটপাট হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গভর্নর বলেন, যারা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে নিয়ে গেছে, তাদের কাছে এখন আর সেই টাকা অবশিষ্ট নেই। এই হারিয়ে যাওয়া অর্থ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, তা নিয়ে বর্তমানে ‘অ্যাসেট রিকোভারি’র কাজ চলছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে অর্থনীতিকে ‘সক্রিয়’ করার লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের সুবিধার্থে একক গ্রাহক ঋণ সীমাও বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেও নেয়া হয়েছে বিশেষ ঋণ প্যাকেজ।
ঋণ প্যাকেজে কি মূল্যস্ফীতি বাড়বে?
অর্থনীতিতে নতুন করে বিশাল অঙ্কের ঋণের যোগান দিলে মূল্যস্ফীতি আরো লাগামহীন হয়ে পড়বে কিনা—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর একক ঋণগ্রহীতার এক্সপোজারের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই সীমা বাড়ানো প্রয়োজন মনে হয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে ব্যাংকগুলো ঢালাওভাবে ঋণ দেবে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রত্যাশা করে ব্যাংকগুলো কেবল ভালো ও বিশ্বস্ত গ্রাহকদেরই এই সুবিধা দেবে।
তিনি আরো নিশ্চিত করেন যে, এই বিশেষ ঋণ প্যাকেজের জন্য কোনো নতুন টাকা ছাপানো হবে না। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা নেই। এই ঋণে সরকার ৬ শতাংশ হারে সুদ ভর্তুকি দেবে। যেসব ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য অলস পড়ে আছে, সেই টাকাই ঋণের মাধ্যমে বাজারে ছেড়ে আবার ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরিয়ে আনা হবে। আইনি কোনো ফাঁকফোকর থাকলে তা সার্কুলারের মাধ্যমে দ্রুত সংশোধন করা হবে বলেও তিনি জানান।
অর্থনীতি বাঁচাতে এই সিদ্ধান্ত ছাড়া উপায় ছিল না
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, বর্তমানে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীদের হাতে চলতি মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে, তাদের কাছে কোনো টাকা নেই।
দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে এই মুহূর্তে টেনে তুলতে এবং চাঙ্গা করতে এই ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেন।


