
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মোঃ মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন—কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় ১০ মাস পর একই ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হলো।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে ওই সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় ঘোষণা করা হলো।
দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাতটি রায়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি কাউন্ট বা অভিযোগ আনা হয়।
প্রথম কাউন্টে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথন হয়। আন্দোলন দমনের বিষয়ে সরাসরি নির্দেশ দিতে গিয়ে সাদ্দামকে তিনি বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’
এরপর ১৪ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ বলে সম্বোধন করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে ওবায়দুল কাদের অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন ১৫ জুলাই ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ।’ অভিযোগ অনুযায়ী, এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের লেলিয়ে দেন এবং আন্দোলনকারীদের হত্যায় প্ররোচনা দেন।
অভিযোগে বলা হয়, এসব নির্দেশ ও বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। ওই দিন নারীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
১৬ জুলাই আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে। একই দিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নির্দেশনার পর চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকায় গুলিতে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুক নিহত হন। একই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন।
দ্বিতীয় কাউন্টে বলা হয়, ১৭ জুলাই তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে ঢাকা জেলা ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আন্দোলন দমনে নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।
১৮ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক হিসেবে উল্লেখ করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর কারফিউ ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’ অভিযোগপত্রে এটিকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের কথাও আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মির্জা আজম, শামীম ওসমান, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন এবং ডিবির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ অন্যদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, এসব নির্দেশনার পর মিরপুর, মহাখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলি চালিয়ে বহু আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় কাউন্টে বলা হয়েছে, ৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন।
এর পরদিন ৪ আগস্ট মিরপুরে শাহরিয়ার হাসান আলভী, মিরাজ ফরাজি, মহিউদ্দিনসহ ১২ জন, ফেনীর মহিপালে ইশতিয়াক আহাম্মেদসহ সাতজন এবং লক্ষ্মীপুর সদরে সাদ-আল আফনানসহ চারজন নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫ আগস্ট মিরপুরে মাহফুজুল আলমসহ ২০ জন এবং রাজশাহী মহানগরে রায়হান আলী ও সাকিব আনজুমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও বহু আন্দোলনকারী নিহত হন।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।
বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ১৫ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদেরের সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যে প্ররোচনা দেওয়া হয়, তাতে তিনি সমর্থন জানান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বক্তব্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।
বাহাউদ্দিন নাছিমের প্ররোচনায় চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ ও মো. ফারুক এবং আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিহত হন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
শেখ হাসিনা মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দেন এবং ওবায়দুল কাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেন—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাহাউদ্দিন নাছিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে পরিস্থিতি তদারক করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদ নিহত হন।
৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদেরের সংবাদ সম্মেলনেও বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত ছিলেন। পরদিন ৪ আগস্ট ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এর পর রাজধানীর বাংলামোটর ও পল্টন এলাকায় কয়েকজন এবং ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে, গুলিস্তান, বাংলামোটর ও চাঁনখারপুল এলাকায় আরও কয়েকজন নিহত হন।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই—এমন বক্তব্যসহ বিভিন্ন উসকানিমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দেন তিনি।
১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যে সমর্থন ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে আরাফাতের বিরুদ্ধে। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং হামলার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯ জুলাই এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন আরাফাত। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঁচ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহারের মতো মজুত রয়েছে বলে হুমকিসূচক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর নির্বাচনী এলাকার মহাখালী রেলক্রসিং ও চৌরাস্তা এলাকায় ১৯ জুলাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আরাফাত ছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
২০ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলন দমন ও সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কথা বলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সরকারের সহিংসতার সংবাদ প্রচারের কারণে ১৮ জুলাই বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভি এবং ২২ জুলাই বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪-এর সম্প্রচার সাময়িক বন্ধ করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
৪ আগস্ট আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিলে সংসদ ভবন এলাকায় সংবাদ ব্রিফিংয়ে আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আন্দোলন দমনে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আরাফাতের বিরুদ্ধে।
শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন দমনে নিয়ন্ত্রিত যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন শেখ ফজলে শামস পরশ।
অভিযোগে বলা হয়, তাঁর নির্দেশে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এসব হামলায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা নিহত ও গুরুতর আহত হন।
১৮ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগরে যুবলীগের কর্মীদের গুলিতে তানভীর ছিদ্দিকী, সায়মন মাহিন ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়া নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯ জুলাই মহাখালী এলাকায় গুলিতে শাহাজাহান, গণি মিয়া, আল আমিন রনি, জাহিদ হোসেন, ইমাম মেহেদী হাসান ও মামুন হোসেন নিহত হন।
১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে পরশ আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা’ হিসেবে উল্লেখ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুর শহরে যুবলীগের কর্মীদের গুলিতে সাদ-আল আফনান, ওসমান পাটোয়ারী, সাব্বির হোসেন ও কাওসার নিহত হন। পরদিন রাজশাহী মহানগরে আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নিহত হন।
মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ১২ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি অনুষ্ঠানে তিনি আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করেন এবং আন্দোলন প্রতিহত করতে যুবলীগের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।
১৯ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় মাইনুল নিজে অস্ত্র হাতে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণে অংশ নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেদিন তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় মিরপুরে নির্বিচার গুলিতে রুস্তম ও আসিফ ইকবালসহ ২৬ জন নিহত হন বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে।
৪ আগস্ট মিরপুরে শাহরিয়ার হাসানসহ ১২ জন এবং ৫ আগস্ট মাহফুজুল আলমসহ ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনাতেও তাঁর উপস্থিতি ও তদারকির অভিযোগ রয়েছে।
মাইনুলের বিরুদ্ধেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের সমাবেশে আন্দোলনকারীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন তিনি।
ওবায়দুল কাদেরের ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন’ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীদের প্ররোচিত ও নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
১৫ জুলাই তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও ঢাকা কলেজ শাখার নেতা-কর্মীরা অংশ নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’—ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্যের পর সাদ্দাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন এবং তা তদারক করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
১৫ জুলাই ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে’ এবং ১৬ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর এসব বক্তব্য ও নির্দেশনার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। ১৬ জুলাই সারা দেশে ছয়জন নিহত ও পরদিন চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
১৮ জুলাই ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের গুলিতে সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাদ্দামের বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর আহত করার অভিযোগ রয়েছে।
শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক, বিদ্বেষপূর্ণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করা হয়েছে।
১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন ইনান। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ এবং ঢাকা কলেজ কমিটির নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দামের আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার হুমকির সময় উপস্থিত থেকে তা সমর্থন করেন ইনান। ওই দিন সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।
১৮ জুলাই ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের হামলায় সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। আন্দোলন চলাকালে ইনানের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ইনানের বিরুদ্ধেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।


