Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

তারেক রহমানের ভারত সফর না করার ঘোষণার পরদিনই আদানির বিদ্যুৎ কমল, প্রশ্ন কাকতালীয় নাকি অন্য কিছু?

নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণা আসার পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। কারিগরি ত্রুটির কথা জানিয়ে ৮০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। একই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্যও সামনে আসে।

ঘটনার সময়গত এই মিল নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি নিছক কারিগরি ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটের ধারাবাহিকতা, নাকি ঢাকা-দিল্লির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও কোনো ধরনের চাপ তৈরির উপাদান হয়ে উঠছে?

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে।

ঘোষণার পরদিনই আদানির একটি ইউনিট বন্ধ

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন না। কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও শেষ পর্যন্ত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তিনি অংশ নিচ্ছেন না।

ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন।

এই ঘোষণার পরদিনই সামনে আসে আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে।

ফলে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

বিদ্যুৎ সংকট অবশ্য আগেই ছিল

তবে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এর আগেই গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছিল না। জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছিল।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে আদানি পাওয়ারও জানিয়েছিল, ভারতের রেলপথে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন স্থানে লোডিং বিধিনিষেধ এবং কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

এ কারণে দিনের তুলনামূলক কম চাহিদার সময়ে উৎপাদন কমিয়ে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আগের রাতে আদানির কেন্দ্রটি ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।

কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে ইউনিটটি বন্ধ হয়েছে। মেরামতের আগে ইউনিটটি ঠান্ডা করতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

অর্থাৎ আদানি পাওয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই মুহূর্তের সংকটের কারণ রাজনৈতিক নয়; প্রথমে কয়লা পরিবহনে সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমেছে।

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—এই ব্যাখ্যা কি পুরোপুরি সন্তোষজনক?

২০১৭ সালের চুক্তি, দীর্ঘ ২৫ বছরের দায়

আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

এটি বর্তমান সরকারের করা কোনো চুক্তি নয়। আগের সরকারের সময়ে সম্পাদিত দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল থাকায় বাংলাদেশ এখনো ওই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনছে।

ফলে বর্তমান সংকটের সঙ্গে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়, চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সরবরাহ ব্যাহত হলে আদানির দায় কতটা?

বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি কার্যকর থাকা অবস্থায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের দায় রয়েছে—তা চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা পর্যালোচনা করেই নির্ধারণ করা সম্ভব।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে বিরোধ, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া কিংবা চুক্তি লঙ্ঘনের পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা বা অন্যান্য প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সেটি সম্পূর্ণভাবে চুক্তির শর্ত ও কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।

অতএব, প্রশ্ন শুধু বিদ্যুৎ কেন কমেছে—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সুরক্ষার জন্য চুক্তিতে কী ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এবং প্রয়োজনের সময় সেগুলো কার্যকর হচ্ছে কি না।

আদানির বক্তব্য কী?

২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, রেলওয়ে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন স্থানে লোডিং বিধিনিষেধ এবং কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমে গেছে।

কোম্পানিটি আরও জানায়, বিষয়টি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে এবং ভারতীয় রেলের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।

এর কয়েক দিন পর উৎপাদন আবার বাড়তে শুরু করলেও হঠাৎ বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়।

পিডিবির একজন সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিটটির একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে যাওয়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে ইউনিটটিকে ঠান্ডা করতে হবে এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কারিগরি ত্রুটি অসম্ভব কিছু নয়

একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বড় ও জটিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন সময় যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত কারণে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটতেই পারে।

কিন্তু আন্তঃদেশীয় দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু ত্রুটি ঘটেছে কি না—এতে শেষ হয় না।

মূল প্রশ্ন হলো, ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর কত দ্রুত তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে মিলেই যত প্রশ্ন

ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় সন্দেহের জায়গাটি আরও জোরালো হয়েছে।

আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে দেওয়া প্রকাশ্য বক্তব্য সফর-প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন।

এরপরও সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত সফর নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল।

৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই এবং সফরের তারিখও চূড়ান্ত হয়নি।

১০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট হয়—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না।

বাংলাদেশের অবস্থান ছিল, ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ঢাকার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরকে একটি পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এর ঠিক পরদিনই আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আসে।

ঘটনাগুলো পরপর ঘটেছে—এটি তথ্য। কিন্তু একটি ঘটনার কারণে অন্যটি ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখনো নেই।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে সরলভাবে ‘ভারতবিরোধী’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তবে একই সঙ্গে ঢাকা এখন নিজের সার্বভৌম ও আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোউইচের মতে, অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া উচিত নয়।

দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আগের কাঠামোয় নেই। নতুন বাস্তবতায় দুই দেশকেই সম্পর্কের ভিত্তি নতুন করে নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ কি কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে?

এই প্রশ্ন এখন পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে অনেকটাই আমদানিনির্ভর। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি এবং ব্যাপক লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে।

এ অবস্থায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে।

আর এ কারণেই আদানি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এর আগে বলেছেন, চুক্তিতে গুরুতর অসাম্য থাকলে সেটি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমও চুক্তিটিকে একতরফা হিসেবে সমালোচনা করে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমান সংকট তাই পুরোনো একটি প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কি এমন একটি চুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে?

একটি ইউনিট বন্ধ হলেই কেন এত বড় ঘাটতি?

এখানেই আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিকল্প ব্যবস্থা কোথায়?

একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া নিছক একটি কারিগরি ঘটনা হতে পারে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে এর প্রভাব যদি হাজার হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি বাড়িয়ে দেয়, তাহলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি ব্যবস্থা এবং জরুরি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

কারণ বর্তমান সংকট শুধু আদানির কারণে সৃষ্টি হয়নি।

আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপে ছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল, বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

অর্থাৎ আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়া একটি বিদ্যমান বড় সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

আদানি পাওয়ারের কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি

বর্তমান পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ার এবং সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া জরুরি।

প্রথমত, গোড্ডা কেন্দ্রের বয়লার বা ফিড ইউনিটে ঠিক কী ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে?

দ্বিতীয়ত, ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর কত সময়ের মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু করা হয়েছে?

তৃতীয়ত, একটি ইউনিট বন্ধ থাকলেও অন্য ইউনিটের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা সম্ভব কি না?

চতুর্থত, আগস্ট থেকে কয়লা সরবরাহে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা কেন এত দীর্ঘস্থায়ী হলো?

পঞ্চমত, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ ব্যাহত হলে আদানি পাওয়ারের নির্দিষ্ট দায় কী?

ষষ্ঠত, সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রাখে?

সপ্তমত, সংকট মোকাবিলায় আদানি পাওয়ার বাংলাদেশের কাছে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা সহযোগিতামূলক প্রস্তাব দিয়েছে কি না?

অষ্টমত, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই সরবরাহ সংকট সম্পর্কে অবহিত কি না এবং তারা সমস্যা সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না?

নবমত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কি না?

শেষ প্রশ্নটির উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে কঠিন।

বিদ্যুৎ সংকটের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও সতর্কতা জরুরি

দেশে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হলে তার রাজনৈতিক প্রভাবও পড়ে। লোডশেডিং বাড়লে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের ওপর জনচাপ তৈরি হয়।

তাই বিদ্যুৎ সংকটকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কেউ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কি না, আদানি ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা চলছে কি না কিংবা কোনো পক্ষ এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী বা ভারতবিরোধী জনমত তৈরির চেষ্টা করছে কি না—এসব প্রশ্নও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

কারণ বিদেশি চাপ থাকলেও সেটিকে যদি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশই।

বিদ্যুৎ কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

একইভাবে ভারত বা ভারতের কোনো কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চুক্তি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নয়—চুক্তির শর্ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতি এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ আদানির কাছ থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ নেয় না। এই বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ অর্থ পরিশোধ করে। অর্থাৎ এটি কোনো অনুদান নয়; এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি।

সুতরাং সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের অধিকার কোথায়?

তদন্ত ও তথ্যই দিতে পারে আসল উত্তর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। ঢাকার পক্ষ থেকে ‘অনুকূল পরিবেশের’ কথা বলা হচ্ছিল। ১০ সেপ্টেম্বর স্পষ্ট হয়, তিনি ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে যাচ্ছেন না। এর পরদিনই আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায় এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।

ঘটনাগুলো পাশাপাশি ঘটেছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এই সময়গত মিলকে সরাসরি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখাও সমীচীন নয়।

যদি এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে আদানি পাওয়ারের উচিত দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দেওয়া।

আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে—প্রতিহিংসার নয়। আর বিদ্যুৎ কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।

আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি গেলেন না, আর ঠিক তখনই কেন আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেল?

এটি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো হিসাব?

এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়; খুঁজতে হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তথ্য, সরবরাহের রেকর্ড, চুক্তির ধারা, সংশ্লিষ্ট নথি এবং আদানি পাওয়ার ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট জবাবে।

কারণ সন্দেহের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নয়—বাংলাদেশের জনগণের জানার অধিকার রয়েছে প্রকৃত কারণটি কী।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ