
আন্তর্জাতিক ডেস্ক । চেতনা একুশ
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে চাইছে ভারত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতের অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে আগ্রহী দিল্লি। ভারতীয় নীতিনির্ধারক মহলের প্রত্যাশা, ঢাকা এবার এমন এক কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথে হাঁটবে, যেখানে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হবে না।
সম্প্রতি দিল্লি সফররত বাংলাদেশের একদল সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও কৌশলগত বিশ্লেষক পঙ্কজ শরণ এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ভারতের কাছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের অভিজ্ঞতা এখনো দিল্লির নীতিনির্ধারকদের স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে রয়ে গেছে।
পঙ্কজ শরণের ভাষায়, ওই সময়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দিল্লির উদ্বেগকে বাংলাদেশ গুরুত্ব দেয়নি। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় অচল অবস্থায় পৌঁছেছিল। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম এসেছে এবং দিল্লি সেই নেতৃত্বকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। পরবর্তীতে দুই নেতার মধ্যে যোগাযোগও হয়েছে। এসব ঘটনাকে ভারত নতুন সম্পর্কের সূচনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
দিল্লির মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাজনৈতিক আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই এবার বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশকে বুঝতে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন প্রতিনিধি প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে পঙ্কজ শরণ বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৫ সালের পর শেখ হাসিনাও দীর্ঘ সময় দিল্লিতে অবস্থান করেছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় বিষয়টি দুই সরকার কীভাবে পরিচালনা করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার মতে, সীমান্ত অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো অবৈধ কর্মকাণ্ডনির্ভর। চোরাচালান, অস্ত্র ও অপরাধচক্রের কারণে সাধারণ মানুষও ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আস্থা ও সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন পঙ্কজ শরণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলে চীনের সহায়তায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, কারণ এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। তবে অভিন্ন নদী হওয়ায় ভারত বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। জানান, নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে পানিপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে।
বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেটিকে অতিরঞ্জিত বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই কূটনীতিক। তার মতে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ। তবে এ বিষয়ে অনেক প্রচারই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের সব মিডিয়াকে এককভাবে বিচার করা ঠিক নয়। কিছু গণমাধ্যম নেতিবাচক প্রচার চালালেও সামগ্রিকভাবে সম্পর্ক উন্নয়নে মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকাও রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়কে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন পঙ্কজ শরণ। তার মতে, কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গে একই দলের সরকার থাকলে বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানে সমন্বয় সহজ হবে।সার্ক প্রসঙ্গে তিনি কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আঞ্চলিক এই জোট প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে।
উগ্রবাদ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও সতর্ক মন্তব্য করেন।
পঙ্কজ শরণ আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারত একদিকে নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক থাকলেও অন্যদিকে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই কূটনীতিক।


