
নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ
প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে মানুষ হত্যা, চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা এবং দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যাওয়ার মতো একাধিক ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছিলেন চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মো. মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’। দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত গত বুধবার ফটিকছড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানোর পর মোবারক ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করতেন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার লোকালয়ে ফিরে খুন, চাঁদাবাজি ও গুলির ঘটনায় জড়িয়ে পড়তেন তিনি।
গ্রেপ্তারের সময় মোবারকের সঙ্গে তাঁর আরও তিন সহযোগীকে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি এবং চারটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় মোবারক পুলিশকে লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন। পরে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়।
পুলিশের দাবি, মোবারকের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি পিস্তল ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি অত্যাধুনিক অস্ত্র সঙ্গে রাখতেন এবং এসএমজি ধরনের একটি অস্ত্র নিয়ে ঘুমাতেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
মাসুদ হত্যা থেকে শনাক্ত
গত ১৩ জুন বেলা দেড়টার দিকে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে।
পুলিশের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোবারককে শনাক্ত করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, মাসুদুল হক দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর পেছনে অস্ত্রধারীরা ছুটছেন। একপর্যায়ে বাজারের একটি দোকানের সামনে রাখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান।
এরপর মোবারকসহ অস্ত্রধারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। প্রথম দফায় গুলি করে চলে যাওয়ার পর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে আবার সেখানে ফিরে আসেন মোবারক। গাড়িতে না উঠে ফের গুলি করেন তিনি। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের ভাষ্য, মোবারকই প্রথম মাসুদুল হককে গুলি করেন। পরে মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। গ্রেপ্তারের পর মোবারক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
অপরাধজগতে প্রবেশ
ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে মোবারক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তেমন সুযোগ হয়নি তাঁর। নিজের নাম কোনোভাবে লিখতে পারলেও পড়তে পারেন না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি রংমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে মো. বাবু নামের এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এরপর থেকেই ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিতি পান তিনি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত নাছির উদ্দিনের মাধ্যমে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন মোবারক। নাছির কারাগারে যাওয়ার পর উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু তৈয়বের সঙ্গে মোবারকের একাধিক ছবিও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের সঙ্গে যুক্ত হন মোবারক। বর্তমানে ইমন কারাগারে রয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে কাজ করতেন মোবারক।
ইমন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অন্যতম সহযোগী বলে জানিয়েছে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, মোবারকও বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছিলেন। সাজ্জাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতেন তিনি।
পুলিশের দাবি, সাজ্জাদ বাহিনীতে সাহসী এবং অস্ত্র চালনায় দক্ষ হিসেবে মোবারকের আলাদা গুরুত্ব ছিল। দুই হাতে একসঙ্গে গুলি চালাতে পারতেন তিনি।
দুই হাতে অস্ত্র চালানো ছিল ‘শখ’
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক জানিয়েছেন, ইমনের কাছ থেকেই অস্ত্র চালানো শিখেছেন তিনি। দুই হাতে অস্ত্র চালানো তাঁর শখ ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যার সময় সিসিটিভি ফুটেজে মোবারককে দুই হাতে অস্ত্র চালাতে দেখা গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ
মাসুদুল হক হত্যা ছাড়াও চট্টগ্রাম নগর ও জেলার আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি-মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি চালিয়ে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া গত বছরের ২৯ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে গুলি করে দুজনকে হত্যা, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা এবং ২২ এপ্রিল রাউজানের গাজীপাড়ায় যুবদলকর্মী ইব্রাহিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনাতেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট অক্সিজেন-পশ্চিম কুয়াইশে মো. মাসুদ ও মো. আনিছকে হত্যা এবং এক মাস পর চান্দগাঁওয়ের একটি চায়ের দোকানে বসে ইট-বালু ব্যবসায়ী তাহসীনকে গুলি করে হত্যার ঘটনাতেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ বলছে, ফটিকছড়ির জামাল ও সাদ্দাম হত্যাসহ অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডে মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
চাঁদা না পেলে গুলি করার অভিযোগ
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চাঁদা দাবি এবং টাকা না পেলে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে গুলি করার অভিযোগও রয়েছে মোবারকের বিরুদ্ধে।
নগরের চন্দনপুরায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে পুলিশি পাহারার মধ্যেও গুলি চালানোর ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক অস্ত্রধারী দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে গুলি করছেন। অন্যদের একজনের হাতে এসএমজি, আরেকজনের কাছে চায়নিজ রাইফেল এবং অন্য একজনের হাতে শটগান ছিল। পুলিশ বলছে, অস্ত্রধারীদের একজন ছিলেন মোবারক।
গত বছরের ২০ আগস্ট হাটহাজারীর মেখল এলাকায় একটি ইটভাটা ও আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাড়িতেও গুলি চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ওই হামলা চালানো হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজে মোবারক ও তাঁর সহযোগীদের বাড়ির উঠানে ঢুকে গুলি করতে দেখা যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ১৪ মে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে ব্যবসায়ী আবছার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে গুলির ঘটনাতেও মোবারকের উপস্থিতি সিসিটিভিতে ধরা পড়ে।
আবছার উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রায় এক মাস ধরে তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। টাকা না দেওয়ায় মোবারকসহ সাতজন অস্ত্র নিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে আসে। আশপাশের লোকজন চিৎকার শুরু করলে তাঁরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যায়। পরে বাড়ির পাশের একটি দোকান লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়।
এসএমজি নিয়ে ঘুমাতেন
গ্রেপ্তারের পর মোবারকের কাছে এসএমজি নিয়ে ঘুমানোর একটি ছবি পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, এসএমজি নিয়ে ঘুমাতে তাঁর ভালো লাগত।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার এড়াতে মোবারক সব সময় নিজের সঙ্গে বিদেশি পিস্তল রাখতেন। পাশাপাশি হাতের নাগালে রাখতেন এসএমজি।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, ছবিতে দেখা এসএমজিটি বর্তমানে পলাতক সন্ত্রাসী রায়হানের কাছে রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন মোবারক। অস্ত্রটি উদ্ধারে অভিযান চলছে।
পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রেই পুলিশকে গুলি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ৭৯৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৬ হাজার ৮৫৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১৪৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের আশঙ্কা, এসব অস্ত্রের একটি অংশ এখনো অপরাধীদের হাতে রয়েছে। মোবারককে গ্রেপ্তারের সময়ও এর প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ জানায়, কাঞ্চননগরের একটি বাড়ির ওয়াশরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে ছিলেন মোবারক। পুলিশ তাঁকে বেরিয়ে আসতে বললে ভেতর থেকে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন তিনি। পরে পুলিশও পাল্টা গুলি চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, মোবারকের কাছ থেকে উদ্ধার করা ব্রাজিলের তৈরি পিস্তলটি চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
দুর্গম পাহাড়ে মিলত আশ্রয়
প্রকাশ্যে গুলি চালানো কিংবা হত্যাকাণ্ডের পরও কীভাবে বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতেন মোবারক—এ প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ সামনে এনেছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বিষয়টি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ছিল মোবারকের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কোনো অপরাধের পর সেখানে আত্মগোপন করে কিছুদিন কাটাতেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার লোকালয়ে ফিরে আসতেন।
পুলিশের দাবি, পাহাড়ে যোগাযোগ ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রে মোবারক তাঁর প্রথম স্ত্রী ডলি চাকমা ও দ্বিতীয় স্ত্রী রুনু আক্তারের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির সহযোগিতা পেতেন। ডলির মাধ্যমে পাহাড়ি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে মোবারকের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল বলেও পুলিশের দাবি।
অস্ত্র কেনাবেচা ও মজুতের ক্ষেত্রেও ওই যোগাযোগ কাজে লাগানো হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
এদিকে রাউজানে গুলিতে নিহত যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীর বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী বলেন, দিনের বেলায় বাজারের মধ্যে মানুষ হত্যা করে অস্ত্র উঁচিয়ে সন্ত্রাসীরা চলে যায়। এসব আসামি জামিনে বেরিয়ে এলে সাধারণ মানুষ আরও আতঙ্কের মধ্যে থাকবে।


