Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

পিতা-মাতার ভরণপোষণ প্রদানে সন্তান বাধ্য: ২০১৩ সালে প্রণীত হয়েছে আইন, প্রয়োজন সচেতনতা

প্রতিবেদক: এড্ নাসরিন বেগম

বাবা–মা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের সেবা, যত্ন ও ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানের ওপরই বর্তায়। এটি শুধু একটি নৈতিক কর্তব্য নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানো থেকে শুরু করে তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠার পেছনে মা–বাবা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, শ্রম ও ত্যাগ উৎসর্গ করেন। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা এবং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়া সন্তানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

তবে বর্তমান সমাজে বাস্তব চিত্র সব সময় আশাব্যঞ্জক নয়। নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণে অনেক প্রবীণ মা–বাবা বার্ধক্যে অবহেলা, একাকীত্ব এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হন। কেউ কেউ সন্তানের কাছ থেকে পর্যাপ্ত ভরণপোষণ পান না, আবার অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।

এমন বাস্তবতায় প্রবীণ মা–বাবার অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ২০১৩ সালে প্রণীত ‘পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান তাঁর মা–বাবার ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় দেখভালের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য। মা–বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন এখন কেবল মানবিকতার বিষয় নয়; এটি দেশের প্রচলিত আইন দ্বারা স্বীকৃত একটি বাধ্যবাধকতাও।

কাজেই কোনো সন্তান যদি পিতা-মাতার ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানায় বা দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে আদালতে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ রয়েছে।

আইনে যা বলা আছে

​মা-বাবার নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করা এবং সন্তানের সঙ্গে তাদের বসবাস বাধ্যতামূলক করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য। আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। যদি একাধিক সন্তান থাকে, তবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।

​আইনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক নিচে দেওয়া হলো:

  • ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে নয়: কোনো সন্তানই তার মা-বাবাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা আলাদা কোনো স্থানে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না।
  • চিকিৎসা ও নিয়মিত খোঁজখবর: সন্তানদের নিয়মিত মা-বাবার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
  • সঙ্গ দেওয়া ও মানসিক সমর্থন: কেবল টাকা-পয়সা দেওয়াই শেষ কথা নয়, মা-বাবাকে নিয়মিত সময় ও সঙ্গ দেওয়া সন্তানের আইনি দায়িত্ব।
  • পারিবারিক বাধা ও অপরাধ: সন্তানের স্ত্রী, সন্তান বা কোনো নিকটাত্মীয় যদি মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়, তবে তারাও সমান অপরাধী বলে গণ্য হবেন এবং আইনের আওতায় শাস্তির মুখোমুখি হবেন।
  • আলাদা থাকলেও অর্থ প্রদান: মা-বাবা যদি সন্তানদের সাথে না থেকে আলাদা থাকেন, তবে সন্তানের দৈনন্দিন বা মাসিক আয় থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত অংশ নিয়মিত তাদের পাঠাতে হবে।

​আইন অমান্যের শাস্তি

​কোনো সন্তান যদি এই আইন লঙ্ঘন করে মা-বাবাকে অবহেলা করে, তবে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এর বিচার হবে। তবে এই আইনের অধীনে মামলা করতে হলে পিতা বা মাতাকে নিজে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হবে। অবশ্য আইনে শুরুতেই আপস-নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধী সন্তানের ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

​সন্তান না থাকলে বা অপারগ হলে করণীয়

​আইনটিকে আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিধিমালা, ২০২৩’ প্রণয়ন করেছে।

  • পরিচর্যাকেন্দ্রের ব্যবস্থা: কোনো সন্তান যদি বাস্তবসম্মত কোনো কারণে মা-বাবাকে নিজের কাছে রাখতে অসমর্থ হয়, তবে বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি ‘পরিচর্যাকেন্দ্রে’ রেখে তাদের দেখভালের ব্যবস্থা করা যাবে।
  • সন্তানহীন প্রবীণদের সুরক্ষা: মা-বাবার কোনো সন্তান জীবিত না থাকলে বা দেখভাল করার মতো কেউ না থাকলে, সংশ্লিষ্ট ‘ভরণপোষণ কমিটি’ তাদের পরিচর্যাকেন্দ্রে পাঠানোর দায়িত্ব নেবে।
  • ভরণপোষণ তহবিল: অসহায় ও দুস্থ মা-বাবার সহায়তার জন্য সরকারি অনুদান এবং দেশি-বিদেশি অনুদানের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘ভরণপোষণ তহবিল’ গঠনের রূপরেখাও এই বিধিমালায় যুক্ত করা হয়েছে।

এই বিষয়ে ল অ্যান্ড জাস্টিস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও এডভোকেট জনাব ড. মুহাম্মদ হায়দার আলী বলেন, এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ আমাদের দেশের আইনি ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক এবং মানবিক দলিল। কিন্তু এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আইনটি পাসের এত বছর পরেও সাধারণ মানুষের মাঝে এর প্রচার ও প্রয়োগ আশানুরূপ নয়। আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও সন্তানদের একটি অংশের মধ্যে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে যে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং প্রচলিত আইনেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ​এই আইনের মূল কথা হলো—সন্তানদের যেকোনো পরিস্থিতিতে পিতা-মাতার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সঙ্গী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সন্তান পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও আলাদা রাখতে পারবেন না।
তিনি বলেন, ​এই বিষয়ে সরকারের আরও করণীয় রয়েছে। ​আইন শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই হয় না, তার সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও কিছু জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। যেমন- ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে গণমাধ্যম (টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র) এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই আইনের শাস্তি ও বাধ্যবাধকতা নিয়ে নিয়মিত প্রচারণামূলক কন্টেন্ট বা ওভিসি (OVC) প্রচার করা উচিত।


তিনি আরো বলেন, ​পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব এবং এই আইনটি সম্পর্কে ছোট ছোট গল্প বা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার, যাতে ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতা গড়ে ওঠে। এছাড়া, ​সহজ আইনি সহায়তা ও হেল্পলাইন করা উচিৎ। অনেক পিতা-মাতা সন্তানের বিরুদ্ধে থানায় বা আদালতে যেতে সংকোচ বোধ করেন। সরকারের উচিত একটি ডেডিকেটেড টোল-ফ্রি হেল্পলাইন (যেমন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে) চালু করা, যেখানে পিতা-মাতারা গোপনে অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং আইনি সহায়তা পাবেন। সর্বোপরি, ​স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ে একটি বিশেষ সেল বা কমিটি গঠন করা উচিত, যারা নিজ নিজ এলাকায় কোনো বৃদ্ধ পিতা-মাতা অবহেলিত হচ্ছেন কি না, তা নিয়মিত তদারকি করবে।


​পরিশেষে তিনি বলেন, আইন করে হয়তো শাস্তি দেওয়া যায়, কিন্তু শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আদায় করা যায় না। ল অ্যান্ড জাস্টিস ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে , আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সন্তান হিসেবে আমাদের মনে রাখা উচিত—আজ আমরা আমাদের পিতা-মাতার সাথে যে আচরণ করছি, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানেরাও আমাদের সাথে ঠিক একই আচরণ করবে।”

অতএব, বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হলে মানুষ নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হবে এবং প্রবীণ পিতা-মাতার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ