Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

বিচারকের পর্যবেক্ষণ: ‌’এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন বেদনা, ক্ষোভ, চরম উদ্বেগ আর ন্যায়বিচারের আকুল প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ ‘

ঢাকার পল্লবীতে মাত্র আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দুই নরপিশাচের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। একই সাথে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, যা আদায় করে ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।


দণ্ড ঘোষণার আগে দেওয়া এক আবেগঘন ও কঠোর পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞ বিচারক বলেন, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন বেদনা, ক্ষোভ, চরম উদ্বেগ আর ন্যায়বিচারের আকুল প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। যখন একটি অবুঝ শিশু এমন জঘন্য লালসা ও সহিংসতার শিকার হয়, তখন তা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না, বরং গোটা সমাজের বিবেককে ক্ষতবিক্ষত করে এবং রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

আদালতের কঠিন পর্যবেক্ষণ ও সমাজের প্রতি বার্তা

বিচারক মাসরুর সালেকীন তার পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেকোনো সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে এই ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০-এরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। প্রতিটি মামলার পেছনেই লুকিয়ে আছে একেকটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা আর পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।


তবে এই মামলাটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল এবং সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের উপস্থিত নিশ্চিত করায় তদন্তকারী সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে ধন্যবাদ জানান আদালত। আবেগ দিয়ে নয়, বরং আইন, অকাট্য প্রমাণ এবং চিরন্তন ন্যায়বিচারের আলোকেই এই রায় দেওয়া হয়েছে বলে আদালত স্পষ্ট করেন।

অপরাধের রোমহর্ষক বিবরণ ও বিচারিক সিদ্ধান্ত

মামলার বিবরণী ও সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে ওই শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর প্রধান আসামি সোহেল রানা শৌচাগারের গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ফ্ল্যাট থেকেই আটক করা হয়। পরবর্তীতে ফতুল্লা থেকে সোহেলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।


তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য, সুরতহাল ও চিকিৎসকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে, আসামি সোহেল রানা এই পাশবিক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা। অন্যদিকে, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার সেই ফ্ল্যাটে উপস্থিত থেকেও এই নৃশংস অপরাধে বাধা না দিয়ে, উল্টো লাশ গুম ও স্বামীকে সহযোগিতা করেছেন। ফলে অপরাধের দায় ও তীব্রতার বিচারে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই সমভাবে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ বহাল রাখা হয়েছে।


আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে তা ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এই রায় যেন সমাজে শিশুদের প্রতি হওয়া সকল সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি কঠোর ও অবিনশ্বর হুঁশিয়ারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়—এটাই এখন সচেতন মহলের প্রত্যাশা।

রিপোর্টার : এড্. নাসরিন বেগম, সহ-সম্পাদক, চেতনা একুশ

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ