
প্রতিবেদক: নাসরিন বেগম
ঝিনাইদহের একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ দাখিলা বইয়ের পাতা গায়েব এবং সরকারি নথি বিনষ্টের চাঞ্চল্যকর মামলায় রেজাউল হক ভাস্কর নামের এক অফিস সহায়ককে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
১৮ জুন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে যশোরের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক এস এম নূরুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত রেজাউল হক ভাস্কর ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পান্তাপাড়া গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে। অপরাধ সংঘটনের সময় তিনি মহেশপুরের নেপা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
যেভাবে প্রকাশ্যে আসে জালিয়াতি
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, বিগত ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর নেপা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের একটি দাখিলা বই থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে আটটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরবর্তীতে ২৯ নভেম্বর আকস্মিক এক দাপ্তরিক পরিদর্শনে বিষয়টি ধরা পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অভিযুক্ত অফিস সহায়ক রেজাউল হক ভাস্কর নিজের অপরাধ স্বীকার করেন।
ঘটনার ভয়াবহতা আমলে নিয়ে মহেশপুরের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নির্দেশে পুলিশ ও ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে আসামি ভাস্করের বাসভবনে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযান থেকে সরকারি দাখিলার কপি, দুটি ডি.সি.আর কপি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির নামে তৈরি করা অসংখ্য ভুয়া সিলমোহর ও অবৈধ অর্থ উদ্ধার করা হয়। সরকারি নথিপত্র ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের এই ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে নেপা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আলী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও রায়
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎকালীন সহকারী পরিচালক রিজিয়া খাতুন দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি পর্যালোচনা শেষে আসামির বিরুদ্ধে আনীত সব অপরাধের সত্যতা পান।
আদালত দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে আসামিকে নিম্নোক্ত সাজা প্রদান করেন:
- ৪৬৭ ধারা (জালিয়াতি): ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
- ৪৬৮ ধারা (প্রতারণা): ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
- ২০১ ধারা (সাক্ষ্য-প্রমাণ লোপাট): ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
- দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা: ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
- ১৬১ ধারা ও অন্যান্য ধারা: আরও ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।
আইনি ব্যাখ্যা:
আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিজ্ঞ আদালত বিভিন্ন ধারায় আসামিকে সর্বমোট ২৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে রায়ের বিশেষ নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সব সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হবে। আইনগত এই জটিলতার কারণে সাজাগুলোর মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ—অর্থাৎ আসামিকে প্রকৃতপক্ষে ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।রাষ্ট্রীয় ও জনগণের আমানত রক্ষা এবং দুর্নীতি দমনে আদালতের এই রায় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


