Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, পদদলিত হয়ে শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি, চেতনা একুশ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হয়ে এক অজ্ঞাতপরিচয় শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার এ ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন—নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বশী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া এলাকার শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার রমজান (৩৮) ও জাহানারা (৫০) এবং ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা এলাকার কুলসুমা (৩৫)। নিহত অপর শিশুটির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

লিফটের কন্ট্রোল রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের ওপরের অংশ থেকে হঠাৎ ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই ধোঁয়া বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আগুনের উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শিশু ওয়ার্ডে আগুন লেগেছে—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতালজুড়ে।

পরে জানা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলার ছাদে থাকা ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে আতঙ্কিত হয়ে গুরুতর অসুস্থ রোগীরাও স্বজনদের সহায়তায় দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সংকীর্ণ সিঁড়িতে ব্যাপক ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এতে অনেকে পড়ে গেলে তাদের ওপর দিয়ে অন্যরা চলে যাওয়ায় পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর হাসপাতাল চত্বরে অনেক রোগীকে মাথা ও হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় দেখা যায়। স্বজনদের কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ আহত রোগীদের নিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন।

‘চোখের সামনে প্রচণ্ড ধোঁয়া দেখতে পাই’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হারেস মিয়া জানান, হঠাৎ প্রচণ্ড ধোঁয়া দেখে চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। এরপর সবাই একযোগে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করলে হুড়োহুড়ির মধ্যে অনেক মানুষ পড়ে গিয়ে আহত হন।

আরেক রোগী মারিয়া খাতুন বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি স্বনামধন্য চিকিৎসাকেন্দ্র। অথচ মাঝেমধ্যেই এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও স্বজনদের যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, তাহলে হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে

খবর পেয়ে সদর ফায়ার স্টেশন ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফায়ার স্টেশন থেকে মোট ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এর মধ্যে চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে সরাসরি কাজ করে। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

আগুন নিয়ন্ত্রণের পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালান এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।

শর্টসার্কিট বা অতিরিক্ত উত্তাপের আশঙ্কা

অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে ময়মনসিংহ সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাজ উদ্দিন এবং হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান জানান, প্রাথমিকভাবে লিফটের মেশিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়া অথবা শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে লিফটের কন্ট্রোল রুম অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। সেখান থেকে প্রচুর ধোঁয়া বের হয়। আগুনে বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি না হলেও ধোঁয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আতঙ্ক থেকেই মূলত প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

তদন্তের উদ্যোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর রোগীদের ধীরে ধীরে নিজ নিজ শয্যায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ড, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে হাসপাতালের পক্ষ থেকেও একটি প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান। তিনি হাসপাতালের লিফট ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালে লিফট প্রায়ই অচল থাকে। এতে রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কোনো ধরনের গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, এর আগেও এই হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে কারও অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ও স্বজনের সমাগম ঘটে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে—সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

সচেতন মহলের মতে, অগ্নিকাণ্ডের পর বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি না হলেও সামান্য ধোঁয়াতেই হাসপাতালের ভেতরে যে ভয়াবহ আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ঘটনায় ছয়জনের প্রাণহানি শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়; বরং দেশের বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনব্যবস্থা এবং রোগী ব্যবস্থাপনা কতটা প্রস্তুত—সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ