ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি বাঁকে গিরগিটির মতো রঙ বদলে দেশের নীতিনির্ধারণী মহলকে ধোঁকা দেওয়া এক অনন্য ও শীর্ষ প্রতারকের নাম মাহামুদুল হাসান। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দৌড় কেবল ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস পর্যন্ত। অথচ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নিজের নামের আগে যুক্ত করেছেন ‘প্রেরা’ ও ‘প্রফেসর’ তকমা। দাবি করেছেন উত্তর আমেরিকার কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের। এই সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর মতো নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতাও করেছেন।
সর্ব ডানে সেই মাহমুদুল
প্রতারণাকেই মূল পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এই চতুর ব্যক্তি ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিতে বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের উপদেষ্টার রূপ ধারণ করেছেন। এমনকি গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কৌশলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদও বাগিয়ে নেন। তবে আভিজাত্য আর উচ্চশিক্ষার এই চটকদার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিকৃত মানসিকতার নৃশংস অপরাধী। অনুসন্ধানে তার একাধিক বিয়ে এবং বহু নারীর জীবন ধ্বংসের রোমহর্ষক কাহিনী উন্মোচিত হয়েছে। এমনকি নিজের শ্বশুরবাড়ির ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণের দায়ে তার জেল খাটার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। পরবর্তীতে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ওই মামলার সাক্ষীদের আদালতে যেতে বাধ্য করা হয়। একই সাথে নিজের বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তার ১৬ বছরের প্রথম সন্তান, সাবেক স্ত্রী এবং তার পুরো পরিবারকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে নানাভাবে হয়রানি করেছেন।
এই মহাপ্রতারক বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিজেকে একজন ভুয়া ‘সংস্কারক’ সাজিয়ে সারা দেশে নতুন করে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিলেন। ক্ষমতার দম্ভে আইন, সমাজ ও পরিবারকে জিম্মি করে রাখা এই স্বঘোষিত ‘ভিআইপি’ গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের আসল চেহারা আড়াল করে রেখেছিলেন।
ছাত্রজীবনেই প্রতারণার হাতেখড়ি
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহামুদুল হাসানের এই জালিয়াতির অধ্যায় শুরু হয়েছিল তার ছাত্রজীবন থেকেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ আওয়াল সম্পর্কে মাহামুদুলের মায়ের মামা। এই আত্মীয়তার সুবাদে ১৯৯৯ সালের ফল সেমিস্টারে তিনি বিবিএতে ভর্তি হন। তবে পড়াশোনায় মন না দিয়ে সেখানে শুরু করেন অবৈধ ভর্তি বাণিজ্য। পরবর্তীতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তানকে নর্থ সাউথে ভর্তিতে সহায়তার সূত্র ধরে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন এবং সেই পরিবারের সহায়তায় যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।
লন্ডনে যাওয়ার পর তার জালিয়াতির পরিধি আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি, যার ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। একই সাথে ‘ই-ফাইভ-কাউন্সিল’ নামক একটি নামসর্বস্ব ভুঁইফোঁড় সংগঠন খুলে নিজেকে সেটির চেয়ারম্যান দাবি করেন। দেশের মন্ত্রী, এমপি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ‘বিদেশি প্রতিনিধি’ এনে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে শিডিউল বা বৈঠকের সময় চাইতেন। এছাড়া লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করতেন। ২০০৯ সালের দিকে এই ভয়াবহ জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়ায় যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা ‘ব্যান’ জারি করে।
ভোল বদলে কট্টর আওয়ামী লীগার ও শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জালিয়াতির দায়ে যুক্তরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে মাহামুদুল কিছুদিন আত্মগোপনে থাকেন। তবে চতুর এই বাজিকর দ্রুতই নিজের রাজনৈতিক রঙ বদলে ফেলেন এবং একপর্যায়ে কট্টর আওয়ামী লীগারের রূপ নেন। নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ পরিচয় দিয়ে দেশে প্রতারণার নতুন ফাঁদ পাতেন।
প্রতারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি ‘প্রিমিয়াম পাস লিমিটেড’ ও ‘পিএপি ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি নামসর্বস্ব এনজিও খোলেন। এই ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্যাড ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিদেশি প্রতিনিধিদের মেইল পাঠিয়ে বৈঠকের সময় বের করতেন। পরবর্তীতে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে এবং বিভিন্ন স্থানে র্যাব মহাপরিচালকের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ভুয়া লোকেশন ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে নিজেকে একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে জাহির করতেন। ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টের এই সাজানো আভিজাত্যকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং দেশের শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-নির্ধারকদের সাথে লবিং করে বড় অঙ্কের অর্থবাণিজ্যের ফাঁদ পাততেন।
দেশে-বিদেশে সব প্রতারণায় মাহামুদুল মূলত তার স্ত্রীদের ঠিকানা ব্যবহার করতেন। তিনি কখনো নিজের স্থায়ী বাসায় থাকতেন না; থাকতেন শ্বশুরালয় বা অন্য স্ত্রীদের বাসায়। এর ফলে তার যাবতীয় প্রতারণার দায়ভার এসে পড়ত স্ত্রী ও তাদের পরিবারের ওপর। অনুসন্ধানে তার স্ত্রীদের বিরুদ্ধে মাহামুদুলের দায়ের করা এবং তার নিজের বিরুদ্ধে হওয়া একাধিক মামলার নথি পাওয়া গেছে।
তার ফেসবুক আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ তিনি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের লোকেশন যুক্ত করে লিখেছেন, ‘উইথ হার এক্সেলেন্সি শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার, গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস অব বাংলাদেশ।’ এর আগে ১৫ মার্চ গণভবনের লোকেশন শেয়ার করে লিখেছেন, ‘উইথ অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার’। ২০২১ সালের ১৪ মার্চ লিখেছেন, ‘মিটিং উইথ ডিরেক্টর জেনারেল র্যাব’ এবং ‘ফরমার হোম স্টেট মিনিস্টার অ্যাট বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্লামেন্ট’।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে তার আনাগোনা বাড়ে। এ সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সাথে ছবি তোলেন এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে প্রতারণা অব্যাহত রাখেন।
শ্বশুরবাড়িতে গৃহকর্মীকে ধর্ষণ ও মামলার ইতিবৃত্ত
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, মাহামুদুলের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট ধর্ষণ মামলা ও তার নিজের দায়ের করা বেশ কিছু মামলার তথ্য মিলেছে। ধর্ষণ মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে গৃহকর্মীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান মাহামুদুল। তার এই বিকৃত যৌনাচার ও প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে তার তৎকালীন দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে তালাক দেন।
মিরপুর থানা পুলিশ তদন্তে মাহামুদুলের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়ে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র নং-৩১৬, তারিখ: ২৭/৮/২০২০) জমা দেয়। মেডিকেল রিপোর্টেও ১৫ বছরের ওই কিশোরী গৃহপরিচারিকার সাথে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ মেলে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি বেশ কয়েক মাস জেল খাটেন। পরবর্তীতে জামিনে বের হয়ে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি দেন। তীব্র হুমকির মুখে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসায় বিচারক তাকে খালাস দিতে বাধ্য হন। তবে পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় দেওয়া অন্তত চারটি জবানবন্দির কপি সংরক্ষিত রয়েছে।
উক্ত মামলার এক সাক্ষী এবং মাহামুদুলের সাবেক স্ত্রীর মামা মো. নুর মোহাম্মদ জানান,”মাহামুদুল আমাকে ও আমার পরিবারকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। আমার ভাগনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল, কিন্তু ও (মাহামুদুল) তার জীবনটা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিল।”
আদালতে না যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন,”ওই সময় সে ছিল শেখ হাসিনার লোক। জীবন না বাঁচলে বিচার দিয়ে কী করব!”
২০টি ভুয়া সংস্কার কমিশনে কাজের দাবি
মাহামুদুল তার অন্য এক স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার একটি মানহানির মামলা দায়ের করেন। নিজেকে সমাজের উচ্চস্তরের ব্যক্তি প্রমাণ করতে তিনি দাবি করেন, তিনি দেশি-বিদেশি কয়েক ডজন কোম্পানির সাথে যুক্ত এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে তার গভীর যোগাযোগ রয়েছে। মামলার আরজিতে তিনি দাবি করেন, তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, সংবিধান, পুলিশ, নির্বাচন পদ্ধতি, এনবিআর, দুদক, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতসহ মোট ২০টি সংস্কার কমিশনের নির্দেশিকা প্রণয়নে অংশ নিয়েছেন।
অথবা বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত সংস্কার কমিশন ছিল মাত্র ১১টি। এই কমিশনগুলোর সদস্য তালিকায় কোথাও মাহামুদুল হাসানের নাম পাওয়া যায়নি। প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমও তার সাথে কাজ করার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানান, তিনি এই নামের কাউকে চেনেন না।
শিক্ষাজীবনের জালিয়াতি: নর্থ সাউথের সনদ মেলেনি
১৯৯৯ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে ভর্তি হলেও তিনি তার কোর্স সম্পন্ন করেননি। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার ড. আহমেদ তাজমিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয় যে, এম মাহামুদুল হাসান ১৯৯৯ সালের ফল সেমিস্টার থেকে ২০০৩ সালের সামার সেমিস্টার পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকলেও তিনি সেখান থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন বা ডিগ্রি অর্জন করেননি।
সাবেক স্ত্রীর জবানবন্দিতে নির্যাতনের খতিয়ান
মাহামুদুলের সাবেক স্ত্রী, যার সাথে এক যুগ আগে বিচ্ছেদ হয়েছে, তিনি অত্যন্ত আতঙ্কের সাথে জানান যে সরকারি সফরের নামে মিথ্যা বলে মাহামুদুল তাকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর তার আন্তর্জাতিক জালিয়াতি ও যুক্তরাজ্যে ইমিগ্রেশন ব্যানের বিষয়টি প্রকাশ পায়। এর প্রতিবাদ করায় তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। গর্ভবতী অবস্থায় তাকে গর্ভপাতের জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সন্তান জন্মের পর যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি, সাইবার অপরাধের ভুয়া মামলা এবং সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে র্যাব-পুলিশের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হয়।
সাবেক এই স্ত্রী আরও জানান, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও সন্তানের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করে মাহামুদুল পুনরায় হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেন এবং সন্তানের দেশের বাইরে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেন।
এআইইউবি-তে ভুয়া আভিজাত্যের প্রদর্শনী
এআইইউবি-তে গেস্ট টিচার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তার ছাত্র এবং ডিজিএফআই-এর তৎকালীন মেজর (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল) খাইরুল ইসলাম জানান, মাহামুদুল ক্লাসে পড়াশোনার চেয়ে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে জাহির করতেই বেশি পছন্দ করতেন। তিনি ডিজিএফআই প্রধানের সাথে ব্যক্তিগত লবিংয়ের তদবির করতেন এবং সহপাঠীদের সরকারের বিভিন্ন স্তরে লিংক করিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। দাবি অমান্য করলে পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার হুমকিও দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানানো হলে তারা জানায়, ওপরের মহলের বিশেষ সুপারিশ বা রেফারেন্সের কারণে তাকে চাকরিতে রাখা হয়েছে।
জামায়াত আমিরের উপদেষ্টা পদ ও অব্যাহতি
৫ আগস্টের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে লিংক-লবিং করার চেষ্টা করেন মাহামুদুল। এ সময় তিনি তার সঙ্গে থাকা পুরোনো ছবি ব্যবহার করেন। পরে বিষয়টি তার পূর্বপরিচিত এক সাংবাদিকের নজরে এলে তিনি বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জানান। এরপর তার সেখানে ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও জায়গা না পেয়ে সর্বশেষ আশ্রয় নেন জামায়াতে ইসলামীতে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি যাতে আবারও প্রতারণা চালিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য জামায়াতকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। সুচতুর মাহামুদুল একপর্যায়ে গত বছরের ডিসেম্বরে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ বাগিয়ে নেন। কিন্তু সেখানেও স্বভাবসুলভ জালিয়াতি করে জামায়াত আমিরের অনুমতি ছাড়াই নিজেকে ‘মন্ত্রী পদমর্যাদা’ দেওয়ার সুপারিশ করে দলীয় প্যাডে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। বিষয়টি জানাজানি হতেই জামায়াত ইসলামী তাকে দল ও উপদেষ্টার পদ থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দেয়।
সুচতুর ও বিকৃত মানসিকতার এই মহাপ্রতারকের যাবতীয় অন্ধকার কীর্তি এখন প্রকাশ্যে। আইন ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মুখোশধারী অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন সময়ের দাবি।