
নিজস্ব প্রতিবেদক । চেতনা একুশ
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সরকার যে বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে সদস্য পাঠানো হবে কি না—সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। তবে দলটির ভেতরে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে কমিটিতে না যাওয়ার মত। নেতাদের একাংশ মনে করছেন, এই কমিটিতে অংশ নিলে সরকারকে নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া হবে।
গত ২৯ এপ্রিল সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম চাওয়া হয়েছে। সরকারের প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে বিএনপির সাতজন সংসদ সদস্যসহ আরও কয়েকটি দলের প্রতিনিধি। বিরোধী দল নাম দিলে কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে ১৭ জনে।
তবে শুরু থেকেই এ উদ্যোগ নিয়ে বিরোধী শিবিরে রয়েছে স্পষ্ট অনাস্থা। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার – দুই বিষয়ে তাদের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সরকার যেখানে সংশোধনের কথা বলছে, সেখানে জামায়াত চায় পূর্ণাঙ্গ সংস্কার। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কমিটিতে সদস্য পাঠানোর বিষয়ে সরকারকে কোনো নাম দেয়নি বিরোধী দল।জামায়াত ও ১১–দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, তারা শুরু থেকেই সংবিধান সংশোধনের বদলে “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীনদের ঘোষিত ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের আলোকে প্রথমেই একটি সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত ছিল। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে সংশোধন কমিটির প্রস্তাব এনে রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবেশ নষ্ট করেছে।
গত ৩০ এপ্রিল ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকেও এ বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের বেশির ভাগই সরকারের প্রস্তাব নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তাদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরির বদলে আরও সন্দেহ বাড়িয়েছে।
বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান কোনো আন্তরিকতা নেই। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না হওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না করাকে তারা সরকারের অনীহার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
জামায়াতের ভেতরেও এ নিয়ে চলছে নানা পর্যায়ের আলোচনা। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, সরকারের প্রস্তাবিত কমিটিতে জামায়াতের যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, “বিরোধী দল সংশোধন নয়, সংস্কার চেয়েছে। সরকার যে কাঠামোতে এগোতে চাচ্ছে, তার সঙ্গে নীতিগতভাবে আমরা একমত নই।”
অন্যদিকে জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলের অবস্থান বিবেচনায় আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্যও মনে করছেন, সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব এই কমিটিতেও পড়তে পারে। ফলে বিরোধী দল সেখানে অংশ নিলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। বরং সরকার নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেই কমিটিকে ব্যবহার করতে পারে।
এ কারণে জামায়াত এখনই কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চায়। দলটির নেতাদের মতে, তড়িঘড়ি করে সদস্য পাঠানোর চেয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সতর্কভাবে এগোনোই এখন তাদের কৌশল।


