
চেতনা একুশ ডেস্ক:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি ক্যাম্পে একযোগে বর্বরোচিত সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে একদল সন্ত্রাসী। রোববার দিবাগত রাতভর চলা এই অতর্কিত হামলার পর, আজ সকাল থেকে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে বিশাল যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে।তবে অভিযানের গতি রোধ করতে চতুর সন্ত্রাসীরা আগেই আলীনগরের ৩টি এবং জঙ্গল ছলিমপুরের ২টি পয়েন্টে মাটি কাটার যন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) দিয়ে রাস্তা কেটে দেয়। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনগুলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। প্রায় ৩ হাজার একর বিস্তীর্ণ ও দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় তীব্র প্রতিকূলতার মাঝে পায়ে হেঁটে অভিযান চালাতে হচ্ছে যৌথ বাহিনীকে। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
নিস্তব্ধ রাতে অতর্কিত ভারী অস্ত্রের গর্জন
স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার দিবাগত রাত ১২টার পর ছলিমপুর এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে পুরো পাহাড়ি এলাকায় একপ্রকার নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এই সুযোগে রাত ১টার দিকে জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় অবস্থিত র্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প লক্ষ্য করে একযোগে আক্রমণ চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন করে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা এই তাণ্ডব শুরু করে।
হঠাৎ এই আকস্মিক ও অতর্কিত আক্রমণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও, মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি সামলে নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হামলাকারীরা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, এক্সক্যাভেটর দিয়ে র্যাব ক্যাম্পের একটি সীমানা প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশের অপচেষ্টা চালায়।
আড়াই ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধশ্বাস রণক্ষেত্র
রাত ১টা থেকে শুরু করে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পুরো এলাকায় চলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গুলিবিনিময়। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মুহুর্মুহু গর্জনে কেঁপে ওঠে চারপাশ। হামলার খবর পেয়ে দ্রুত রাতেই সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স পাঠানো হয়। রাতের অন্ধকারের কারণে ভেতরে প্রবেশ না করলেও চারপাশ থেকে শক্ত কর্ডন গড়ে তোলে অতিরিক্ত বাহিনী। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় হামলাকারীরা। রাত সাড়ে ৩টার পর ধীরে ধীরে গুলির শব্দ কমতে থাকলেও পুরো এলাকায় এক থমথমে ও রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে।
র্যাব–৭ এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “রাত ১টার পর হঠাৎ ক্যাম্পের চারপাশে গুলির শব্দ বাড়তে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তারা একনাগাড়ে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় আমরাও পাল্টা গুলি ছুড়ি। বর্তমানে আমাদের সব সদস্য নিরাপদ আছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী মাঠে কাজ করছে।”
ক্যাম্পে ডিউটিরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন র্যাব সদস্য জানান, হামলাকারীরা একে–৪৭-সহ অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে গুলির তীব্রতা দেখে ধারণা করা হচ্ছে।
কুখ্যাত ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সম্পৃক্ততা, চলছে চিরুনি অভিযান
ভোর ৫টা থেকে র্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৫ শতাধিক সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী জঙ্গল ছলিমপুরে বড় ধরনের চিরুনি অভিযান শুরু করে। র্যাব কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, র্যাব সদস্য হত্যাসহ অসংখ্য মামলার কুখ্যাত আসামি এবং জঙ্গল ছলিমপুরের ত্রাস হিসেবে পরিচিত ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সদস্যরা সংঘবদ্ধ হয়ে এই সুপরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে।অভিযানে অংশ নেওয়া জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এলাকাটি একদিকে অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, অন্যদিকে এখানে বিপুল সংখ্যক সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের বসবাস রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেই সতর্কতা বজায় রেখে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। রাস্তা কেটে দেওয়ায় পায়ে হেঁটেই পুরো পাহাড়ে তল্লাশি চলছে। অভিযান শেষে আটককৃতদের যাচাই-বাছাই করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা?
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, জঙ্গল ছলিমপুর এলাকাটিকে ঘিরে সরকারের মহাপরিকল্পনা নস্যাৎ করতেই এই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। উল্লেখ্য, এই এলাকায় পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি, কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সরকারের বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। আগামী ঈদুল আজহার পরপরই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই এলাকা পরিদর্শনে আসার এবং নতুন কিছু প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। ঠিক এমন সময়ে এই সশস্ত্র হামলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পরিকল্পিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


