Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

হাসিনা আমলের সীমান্ত চুক্তি নিয়ে অস্বস্তিতে সরকার

বিশেষ প্রতিনিধি, চেতনা একুশ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণসংক্রান্ত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের বিতর্কিত সমঝোতা স্মারক বাতিলের উদ্যোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন ও বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চুক্তিটি বাতিল করা হবে নাকি বহাল রাখা হবে—এ প্রশ্নে সরকারের ভেতরেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ বিষয়ে শেখ হাসিনা সরকারের সময় করা সমঝোতা স্মারক আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত সীমান্তনীতির পরিপন্থী। তাদের ভাষ্য, এমন কোনো ব্যবস্থা যদি একতরফাভাবে অন্য রাষ্ট্রকে সুবিধা দেয়, তাহলে তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের একাধিক সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ২৭১ কিলোমিটার এলাকায় ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে ভারত। অভিযোগ রয়েছে, কিছু স্থানে আন্তর্জাতিক সীমান্তরীতি অমান্য করে শূন্যরেখার কাছাকাছি বা তার ভেতরেও বেড়া স্থাপন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অবশিষ্ট প্রায় ৮৮৫ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে ভারত। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি বাধা দিলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে।

যেভাবে সামনে আসে বিতর্কিত সমঝোতা স্মারক

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সীমান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট কোনো স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া ওই সীমার মধ্যে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করতে হলেও অপর পক্ষের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কয়েক মাস সীমান্তে নতুন করে বেড়া নির্মাণ বা উত্তেজনাকর কর্মকাণ্ড থেকে ভারত বিরত ছিল বলে দাবি করা হয়। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও নওগাঁসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় আবারও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিএসএফ।

বিজিবি বাধা দিলে ভারতীয় পক্ষ ২০১০ সালে সম্পাদিত একটি সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ তোলে। তাদের দাবি, ওই সমঝোতার ভিত্তিতেই তিনবিঘা করিডর এলাকায় শূন্যরেখার কাছে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের সময় সীমান্তে বেড়া নির্মাণসংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেন।

বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে সীমান্তসংক্রান্ত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো পর্যালোচনা করে জাতীয় স্বার্থবিরোধী মনে হওয়া বিষয়গুলো বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময়ের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সম্পাদিত অসম চুক্তিগুলো বাতিলের লক্ষ্যে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

তবে সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কেন বাস্তবায়িত হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তাজনিত যুক্তি সামনে এনে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে চাপ বাড়ায়। তার ভাষায়, শূন্যরেখায় বেড়া নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার মতো কোনো সমঝোতা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদাহানিকর।

কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে ভারতের অবস্থান

ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো ২০২৫ সালে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশ সীমান্তের অধিকাংশ এলাকায় ইতোমধ্যে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তাদের দাবি, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ভারত আরও দাবি করে, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও প্রটোকল অনুসরণ করেই সীমান্ত নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে কিছু এলাকায় জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, জলাভূমি এবং বাংলাদেশের আপত্তির কারণে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

গোপন চুক্তি প্রকাশ ও বাতিলের দাবি

শিক্ষাবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ভারতের সঙ্গে অতীতে সম্পাদিত যেসব চুক্তি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী চুক্তিগুলো বাতিলের উদ্যোগও নিতে হবে।

তার মতে, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের প্রধান দায়বদ্ধতা দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি। সে বিবেচনায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। এমনকি এর বাইরেও কোনো অবকাঠামো নির্মাণের আগে বাংলাদেশকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক।

তার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি থাকলেও তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সীমান্তে বেড়া নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন কোনো চুক্তিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে সীমান্তসংক্রান্ত শেখ হাসিনা আমলের চুক্তি বাতিলের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ