Skip to main content

Chetona Ekush

, ,

৯ মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ১০৯ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার: মানবাধিকার সংস্থা জেএমবিএফ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চেতনা একুশ

মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় অন্তত ৭২টি ঘটনায় ১০৯ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা দায়েরের পরও বিচার নিশ্চিত করতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে। আইনি জটিলতা, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রগতি নেই

নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নিরাপদ পরিবেশের প্রত্যাশায় অভিভাবকেরা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান। কিন্তু সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কোমলমতি শিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা এবং সামাজিক লোকলজ্জার কারণে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়েরই যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, তার একটি উদাহরণ রাজধানীর বনশ্রীর একটি মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর মৃত্যু। গত মে মাসে ওই মাদ্রাসা থেকে শিশুটির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শিশুটির মা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রায় সাত মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পরও বিচার কার্যক্রম দীর্ঘদিন আটকে থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একই সঙ্গে অপরাধের শিকার শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অনেককে বছরের পর বছর বিচার পাওয়ার আশায় বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও নানা প্রতিবন্ধকতায় তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধের যথাযথ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ছেলে শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র

জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ছেলে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১৭১ জন শিশু ভুক্তভোগী হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে বিবেচিত স্থানেও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে সংঘটিত নির্যাতনের বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

তবে নথিভুক্ত ঘটনাই নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র নয় বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক লোকলজ্জা, পরিবারের সম্মানহানির ভয় এবং ছেলে শিশুদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করতে অনীহার কারণে অনেক ঘটনা সামনে আসে না। ফলে অপরাধের প্রকৃত ব্যাপ্তি নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নির্যাতনের শিকার শিশুরা অনেক সময় ভয়ে কিংবা মানসিক চাপে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানাতে পারে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রাখে। এর ফলে শিশুরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এমন অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক বিকাশ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা, বিচারেও বাধা

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধ প্রমাণ করা এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদ্ধতি ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ঘাটতি বিচার নিশ্চিত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান জানান, ছেলে শিশু নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বা স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে।

তার মতে, এসব ক্ষেত্রে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ না করা হলে চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফল, ডিএনএ নমুনা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন সংগ্রহ এবং সংরক্ষণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আদালতে এসব প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহের সময় ও পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগ পাওয়ার পর কীভাবে শিশুর শারীরিক পরীক্ষা করতে হবে, কীভাবে নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে এবং কীভাবে ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও চিকিৎসাকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতে সেসব প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপনের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা ও শিশু সুরক্ষা নীতি

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন বন্ধে শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই চলবে না; প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিমের মতে, মাদ্রাসাসহ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে বয়স উপযোগী ধারণা দিতে হবে। কোন ধরনের স্পর্শ নিরাপদ এবং কোন পরিস্থিতিতে সতর্ক হতে হবে, সে বিষয়ে শিশুদের সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করলে কীভাবে তা বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা অভিভাবককে জানাতে হবে, সেটিও তাদের শেখানো প্রয়োজন।

তবে শুধু শিশুদের সচেতন করাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। নির্যাতনের অভিযোগ জানালে শিশুকে দোষারোপ করা, ভয় দেখানো কিংবা বিষয়টি গোপন রাখতে চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং শিশুর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের শিকার শিশু যেন ভয়, লজ্জা কিংবা সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারে, সে জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্তে সহযোগিতা এবং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করাই এখন চ্যালেঞ্জ

শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অথচ নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরও যদি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে, তবে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রমাণ সংগ্রহ, বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকর অগ্রগতি এবং ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নির্যাতনের ঘটনা গোপন না রেখে নিরাপদ উপায়ে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই শিশু নির্যাতনের দায় এড়ানোর জায়গা হতে পারে না। মাদ্রাসাসহ প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের যথাযথ বিচার এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ